Mein Vaapas Aaunga: ইমতিয়াজ পারলেন, বিবেক হারলেন! “ওরা ভেবেছিল গান্ধীকে মারলেই ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হবে”, মোলাকাতের প্রথম পর্বে মুখোমুখি গান্ধীবাদী শিক্ষাবিদ মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায় One Nation, One Law: এক দেশ, এক আইন প্রজেক্টের নাম “হিন্দি হিন্দু- হিন্দুস্তান” অশান্ত মণিপুরের নেপথ্যে অবৈধ মাদক কারবার? প্রশাসনের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা ‘বাঙালির সন্তান থাকবে রাজমা চাওলে’, নিরামিষ বাংলা গড়ার প্রথম পদক্ষেপ? Gym Jihad: বাজারে নতুন ট্রেন্ড ‘জিম জিহাদ’, ফের ‘খাত্রে মে’ হিন্দুরা? রাজনৈতিক হিংসার দুই অধ্যায় বাজেটে পার্শ্বশিক্ষকদের নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি, যোগ্যতার অমর্যাদা ও আর্থিক বঞ্চনার চালচিত্র!

মণিপুর আমায় ফিরিয়ে দেয় দেশভাগের স্মৃতি

৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

সদ্য প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে সবার প্রথমে উদ্বাস্তু শব্দ বসাতেন। ইস্টবেঙ্গল জিতলে আজও দামাল ছেলের দল সেই ছিন্নমূল, উদ্বাস্তু পরিচয় বুকে নিয়ে গোটা শহর মাতায়। পৃথিবী রঙিন হয়, তবু ভূমধ্যসাগরের পার থেকে ঝা চকচকে লন্ডনে ভিটেহীন মানুষ কালের নিয়মে রয়ে যায়। র‍্যাডক্লিফ লাইনে বসে ষষ্ঠ শ্রেণীর পড়ুয়া মেয়ে ঝড়, বৃষ্টি কিংবা রোদে জানতে পারে না তার দেশ ঠিক কোনটা!

আমরা যারা ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, ফরিদপুরের স্মৃতি মা, ঠাম্মার কাছে শুনে রোমাঞ্চ অনুভব করেছি আর আবেগ শব্দটাকে বাংলা অভিধান থেকে তুলে দিয়ে বাংলাদেশ বসিয়েছি, তারা জানি উদ্বাস্তু শব্দের মানে কিছুটা হলেও। যাদের কাছে স্বাধীনতা মানে এখনো দেশভাগ। যাদের কাছে কীর্তনখোলা, মেঘনা, পদ্মা, ইছামতি বয়ে আনে এক পশলা স্মৃতির বৃষ্টি।

সেসব স্মৃতি মগজে রেখেই আমি খোঁজ শুরু করি মণিপুর দাঙ্গার। নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর থেকে সড়কপথে পৌঁছই ইম্ফল। গত তিন বছর ধরে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ এখানে উদ্বাস্তু। ২০২৬ এর পৃথিবীতে মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ যখন যুদ্ধের কারণে ঘর ছাড়ছেন, লন্ডন-বার্লিনের মতো শহরে ঘরহীন মানুষ বাস্তুহারা হয়ে ত্রিপল টাঙিয়ে থাকছেন, তখন ‘ইন দ্য নেশন অফ মহাত্মা গান্ধী’ জাতিদাঙ্গার কারণে ভিটেমাটি হারিয়ে রিলিফ ক্যাম্পে দিন কাটাচ্ছেন অগণিত মানুষ। বিশ্বাস রাখছেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, ফিরে যাওয়া যাবে নিজভূমে। ঠিক যেভাবে আমাদের মা-ঠাম্মারা বিশ্বাস করতেন দেশ আবার ভাগ হয় নাকি? দাঙ্গা একদিন থামবে। ফিরে যাওয়া যাবে নিজের বসতবাটি বরিশাল, ঢাকা, ময়মনসিংহ।

২০২৩ সালে মে মাসে ঘর ছাড়তে হয়েছিল মণিকাদের। মায়ানমার-ভারত সীমান্তে মোরে জেলায় বিঘাখানেক জমি, দোতলা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছিল ওরা দুই বোন এবং বাবা-মা। কুকিরা সেদিন রাতেই গ্রামের এগারো জন মেইতেই জনজাতির মানুষকে খুন করে। বাজারে সেই খবর রটে গেল কোনোরকমে ঘরে পরবার জামা, আর ছোটখাটো কিছু জিনিস ব্যাগে গুছিয়ে ওদের মতো কয়েকশো পরিবার কেন্দ্রীয় বাহিনীর গাড়িতে উঠে পড়েছিল। স্বয়ং কেন্দ্রীয় বাহিনী জানিয়েছিল মোরে, চুরচাঁদপুরের মতো কুকি অধ্যুষিত এলাকায় মেইতেইদের থাকা বিপজ্জনক। তখন থেকেই এই ক্যাম্পে ঠাঁইনাড়া। ইম্ফলের আইডিয়াল গার্লস কলেজের ভগ্নপ্রায় ঘরে ঠেসাঠেসি করে চারশো মানুষের বাস। সরকার থেকে প্রতিদিন একশো টাকা ডোল দেওয়া হয়। মাত্র তিনটি টয়লেট, দুটো জলের কল আর পচা দুর্গন্ধযুক্ত ডোবার পাশেই যুঝে নিতে হয় জীবনের সঙ্গে। বারোশো টাকার গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে যায় সরকারি ডোল। রাম, লক্ষ্মণ, হনুমান গা ঘেঁষে পুজো নেন ছিন্নমূল মানুষের।কুকি বনাম মেইতেই সংঘর্ষে ২০২৩ সাল থেকেই উত্তপ্ত ভারতের এই ছোট্ট অঙ্গরাজ্য। শুরুটা কুকি বনাম মেইতেই হলেও ২০২৬ এর নয়া সংযোজন নাগা জনজাতি। যখন এই প্রতিবেদনটা লিখছি তখনই ইম্ফলের ধনমঞ্জুরি বিশ্ববিদ্যালয় মোমবাতি মিছিলে হাঁটছে। কারণ গত ১৩ই মে একটি বৌভাতের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে ৬ জন নাগা জনজাতির মানুষকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া কুকিরা আজ প্রায় একমাস পর তাদের শবদেহ ফেরত পাঠিয়েছে। এমনভাবে খুন করা হয়েছে যে তাদের মুখ দেখে চেনার উপায় পর্যন্ত নেই। মণিপুরের একটা বিরাট অংশ আজ প্রশাসনের হাতের বাইরে!

কথা হচ্ছিল থৈবা পেবামের সঙ্গে। চুরচাঁদপুরে একসময় থাকতেন যৌথ পরিবার নিয়ে (এটি বর্তমানে মণিপুরে সবচেয়ে বেশি কুকি অধ্যুষিত এলাকা)। কুকিদের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে মারা গেছেন তার একমাত্র ভাই। তারপর থেকেই ছন্নছাড়া গোটা পরিবার। থৈবা তাঁর স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়েকে নিয়ে থাকছেন সজিবা রিলিফ ক্যাম্পে। মা, বাবা, বোন এবং অন্যান্যরা আছেন সওমবাং রিলিফ ক্যাম্পে। বলছিলেন, যাঁরা জন্মগত মণিপুরের কুকি, তাঁরা ভালো মানুষ। তাঁরা যুদ্ধ চান না। ফোন করে এখনও খোঁজখবর নেন। কিন্তু গত দু বছর ধরে কুকি জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের আসল চাবিকাঠি মায়ানমারের কুকিদের হাতে। ভারত-মায়ানমার সীমান্তের যেহেতু বিরাট অংশে কোনো রকম কাঁটাতার নেই তাই অবাধে চলছে যাতায়াত। একদা আসাম রাইফেলসের আওতায় থাকা এলাকা আজও কব্জা করতে পারেনি বিএসএফ। তাই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবাধে চলছে পোস্ত (পপি) চাষ। মায়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়ায় পৌঁছচ্ছে আফিম, হেরোইন, মরফিনের মতো ক্ষতিকারক ড্রাগস। মাদক পাচারের স্বর্গরাজ্য নামে পরিচিত এই গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলই আসলে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে গোটা দাঙ্গাকে। বন্দুক, বোমা, গুলির জোগান আসে কীভাবে? প্রশ্নের উত্তরে মণিপুরের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী লাবা ইয়ামবেম জানান, “শুধুমাত্র মণিপুরের ভূখণ্ড থেকেই পপি চাষে প্রতিবছর ১৭০০ কোটি টাকা রোজগার মাদক ব্যবসায়ীদের। যেহেতু মায়ানমারের বর্তমান সরকারের পক্ষে রয়েছে চীন, তাই যেকোনো প্রকারে মায়ানমারকে চাপে রাখতে মণিপুরের জাতিদাঙ্গা শেষ হোক চায় না ভারতের বর্তমান সরকার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।”

তাই যে কেন্দ্রীয় সরকার পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে জানে, সে মণিপুরে তিন বছর ধরে চলা জাতিদাঙ্গা নিয়ে চুপ থাকে। প্রচ্ছন্নভাবে কুকি জনজাতির মিলিশিয়াকে মদত দেয়। খোলা আকাশের নিচে বন্দুক কাঁধে ঘুরে বেড়ালেও পদক্ষেপ নেয় না প্রশাসন। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসবার এক মাসের মধ্যে যদি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত জুড়ে কাঁটাতার বসানোর কাজ হতে পারে, অবৈধ নাগরিকদের বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা হতে পারে, তাহলে মণিপুরের ক্ষেত্রে তার আলাদা নিয়ম কেন?প্রশ্ন তোলেন মণিপুরের মানবাধিকার কর্মী থেকে সাধারণ জনগণ। চুপ থাকেন দেশের প্রধানমন্ত্রীও। আর এত কিছুর মাঝেই ঘরছাড়া হয়ে উদ্বাস্তু জীবন কাটাতে হয় পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষকে। পাহাড়ে হাসপাতাল না থাকায় ইম্ফলের মতো সমতল যেখানে মূলত মেইতেই সমাজের মানুষরা থাকেন সেখানে নিরাপত্তার কারণে কুকিরা হাসপাতালে আসতে পারেন না। উল্টোদিকে মেইতেই এবং নাগারা সড়কপথে পৌঁছতে পারেন না নাগাল্যান্ড, আসাম। গোটা রাজ্যে ট্রেন ব্যবস্থা না থাকায় বিমান সংস্থা ভাড়া বাড়িয়েই চলে।

থইবা পেবামের মতো উদ্বাস্তুরা ইম্ফল শহরে এসে আর কাজ জোটাতে পারেন না বলে, বাচ্চারা স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। ওরাও হিন্দু। ওদেরও উপাস্য দেবতার নাম রাম। তবু সে রাম ছবি হয়েই ঝুলে থাকে ক্যাম্পের ময়লা কাপড়ের ফাঁকে। সে রুখে দিতে পারে না যুদ্ধ। একদা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিত্রাঙ্গদা লেখার রসদ পেয়েছিলেন এই মাটি থেকেই। বিশ্বভারতীতে স্থান পেয়েছিল মণিপুরী নৃত্য। এখানকার হাজার বছরের সংস্কৃতি, শাড়ি, পরম্পরা সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই সময় একটা গান্ধীকে প্রয়োজন দেশের। যিনি নোয়াখালী, কলকাতায় দাঙ্গা থামিয়েছিলেন। যার অনশনে হিংসা ছেড়েছিল মৌলবাদীর দল। তাঁকে প্রয়োজন। আজ দেশভাগের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গেলে কেউ দোষ দেয় জিনহাকে, কেউ দেয় গান্ধী, নেহরুকে। কেউ আবার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে। আসলে যে ঠিক কেন দেশভাগ হয়েছিল তার সঠিক কারণ অজানা। তেমনই হাজারটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থাকলেও মণিপুরের জাতিদাঙ্গার নির্দিষ্ট একটি কারণ কেউ জানে না।

অন্যান্য প্রতিবেদন.