সম্প্রতি ভারতবর্ষের শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগ এবং যোগ্যতা নির্ধারণকারী পরীক্ষা বা ‘টেট’ (TET)-কে কেন্দ্র করে এক নতুন ও জটিল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে এই বিতর্কের সবচাইতে সংকটাপন্ন মাত্রাটি হলো— বছরের পর বছর ধরে কর্মরত বা ‘ইন-সার্ভিস’ শিক্ষকদের প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতার কারণে পুনরায় টেট পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করা। এখন প্রশ্ন হলো, যে শিক্ষকেরা ইতিমধ্যেই জীবনের একটা বড় অংশ স্কুলঘরে কাটিয়ে দিলেন, ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ করে আসলেন দিনের পর দিন, তাঁদেরকে আবার নতুন করে প্রাক-চাকরি পর্বের একটি স্ক্রিনিং টেস্টের মুখোমুখি দাঁড় করানো কতটা যুক্তিসঙ্গত? এই প্রশ্নটি আজ দেশের শিক্ষা মহলের সামনে সবথেকে বড় বিতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি কেবল আমলাতান্ত্রিক নিয়মকানুনের অন্ধ অনুসরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে শিক্ষকদের সামাজিক সম্মান, মনস্তত্ত্ব, জীবিকার নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
এই সংকটের আইনি অভিঘাতটি অত্যন্ত তীব্র। সুপ্রিম কোর্টের পূর্বতন নির্দেশিকা এবং এনসিটিই (NCTE)-র কড়া অবস্থানের পর পশ্চিমবঙ্গসহ সারা দেশের আনুমানিক ২০ লক্ষাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকার ভবিষ্যৎ এক গভীর অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। যদিও নিয়মে বলা হয়েছে, যাঁদের অবসরের বয়স মাত্র কয়েক বছর বাকি তাঁরা এই নিয়মের বাইরে থাকবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাকি সিংহভাগ শিক্ষক, যাঁরা জীবনের মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে, তাঁদের এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া কতটা মানবিক? কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের পূর্বতন বিভিন্ন মৌখিক আশ্বাস যে কর্মরতদের টেট দিতে হবে না, তা আজ আদালতের কঠোর মনোভাবের সামনে সম্পূর্ণ অর্থহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। স্বভাবতই এই রায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে শিক্ষক সংগঠনগুলির তরফ থেকে। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ‘এসটিএফআই’ (STFI) ছাড়াও নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি (ABTA), নিখিল বঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, বিজিপিটিএ (BGPTA) ও সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের মতো সংগঠনগুলি সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই ও রিভিউ পিটিশনের রাস্তা বেছে নিয়েছে। অতি সম্প্রতি বিজেপির শিক্ষক সংগঠনও টেট পরীক্ষার বিরোধিতা করেছে, এমনকি সংসদে কর্মরত শিক্ষকদের সুরক্ষার্থে বেসরকারি বিল পর্যন্ত উত্থাপন করা হয়েছে।
এই সংকটের সমাধানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এখন ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও অবস্থান গ্রহণ করছে, যা এই বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারের অবস্থান এই বিষয়ে এখনো চরম ধোঁয়াশাপূর্ণ। একদিকে রাজ্য সরকার শিক্ষক সংগঠনগুলির চাপে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বা রায় পুনর্বিবেচনার কথা মুখে বলছে, অন্যদিকে নিয়োগ দুর্নীতি ও আইনি জটলায় জর্জরিত রাজ্য প্রশাসন এনসিটিই (NCTE)-র নির্দেশিকা সরাসরি অমান্য করে নতুন কোনো আইনি বিপাকে পড়তে চাইছে না। ফলে রাজ্যের লক্ষাধিক ইন-সার্ভিস শিক্ষক আজ এক চরম প্রশাসনিক উদাসীনতা ও দোলাচলের শিকার। সরকার স্পষ্ট করে বলছে না তারা শিক্ষকদের এই পরীক্ষায় বসা থেকে চিরতরে ছাড় দিতে কোনো দৃঢ় অধ্যাদেশ বা স্থায়ী আইন বা অন্য কোনো আইনি সুরক্ষা আনবে কি না। অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও ওড়িশার মতো রাজ্যগুলি এই রায়ের বিরুদ্ধে আইনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে এনসিটিই আইনের ২৩ নম্বর ধারার উপধারাকে চ্যালেঞ্জ করার পথ খুঁজছে। কিছু রাজ্য আবার আদালতের কোপ থেকে বাঁচতে ইন-সার্ভিস শিক্ষকদের জন্য নামমাত্র ‘কোয়ালিফাইং মার্কস’ বা শিথিল নিয়মের তদবির করছে। আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এনসিটিই (NCTE) আইনের মূল ধারা সংশোধন না করলে এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষার অধিকার আইনের (RTE) মূল সুর যেখানে ছিল গুণগত ও মানবিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, সেখানে এই যান্ত্রিক আইনি সমীকরণগুলি আজ অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জন্য এক বেদনাদায়ক প্রহসনে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্রের মাথারা যখন শিক্ষার আঙিনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন আমাদের মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনী’র সেই রাজপণ্ডিতদের কথা, যাঁরা পাখির প্রাণের চেয়ে খাঁচার সংস্কারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যে শিক্ষক দীর্ঘ ১০ বা ১৫ বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম সফলভাবে পড়িয়ে আসছেন, তাঁর অভিজ্ঞতা ও পড়ানোর দক্ষতাই তাঁর আসল পরিচয়। মাঝবয়সে এসে, যখন তিনি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের অন্য এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, তখন তাঁকে কুড়ি-বাইশ বছরের এক তরতাজা চাকরিপ্রার্থীর মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সিলেবাস মুখস্থ করতে বাধ্য করা আসলে তাঁদের অভিজ্ঞতাকে এক কলমে শূন্য করে দেওয়া। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চালচিত্র দেখলে জীবনানন্দের সেই অমোঘ পঙ্ক্তি মনে পড়ে— “অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা; যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই— প্রীতি নেই— করুণার আলোড়ন নেই…” প্রশ্ন ফাঁস আর দুর্নীতির এই মরসুমে যাঁরা প্রকৃত অভিজ্ঞ শিক্ষক, আজ তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা হতে হচ্ছে।এখানে আরও একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক সংকট তলিয়ে দেখা দরকার। একজন শিক্ষক যখন প্রতিদিন ক্লাসে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে দাঁড়ান, তখন তিনি কেবল কিছু তথ্যের আদান-প্রদান করেন না, তিনি একটি নৈতিক কর্তৃত্ব এবং শ্রদ্ধার আসন দাবি করেন। এখন যদি সমাজে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, তাঁদের নিজেদের শিক্ষকেরই চাকরি টিকিয়ে রাখার যোগ্যতা নেই এবং তিনি টেট পরীক্ষায় পাশ করতে পারছেন না— তবে সেই শিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ভরকেন্দ্রটি সম্পূর্ণ চূর্ণ হয়ে যায়। যে রাষ্ট্র শিক্ষককে প্রতিনিয়ত এই অপমানের ট্র্যাকে দৌড় করায়, সেই রাষ্ট্র নিজের অজান্তেই ক্লাসরুমের শৃঙ্খলা ও শিক্ষকের কর্তৃত্বকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
যদি আমরা সততার সাথে শিক্ষার মান বাড়াতে চাই, তবে ওএমআর (OMR) শিটের যান্ত্রিক গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে এসে সরকারকে কিছু বাস্তবমুখী ও স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটতে হবে। প্রথমত, আইনি সুরক্ষা ও সরকারি বিলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের আওতা থেকে বর্তমান কর্মরত শিক্ষকদের সম্পূর্ণ আইনিভাবে বাইরে রাখতে হবে। এই নিয়ম প্রযোজ্য হোক শুধুমাত্র নতুন বা হবু শিক্ষকদের ক্ষেত্রে। সংসদে আনা বিলটিকে সমস্ত রাজ্যের ও সমস্ত দলের সাংসদদের একজোট হয়ে সরকারি বিলে রূপান্তরিত করে পাস করানো দরকার। দ্বিতীয়ত, ইন-সার্ভিস রিফ্রেসার কোর্সের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণশৈলীর সাথে পরিচিত করতে ৩ ঘণ্টার একটি বহু বিকল্পীয় (MCQ) পরীক্ষার বদলে বিকল্প ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হোক। সাধারণ পরীক্ষার্থীদের সিলেবাস কর্মরতদের জন্য অনুপযোগী। তাঁদের জন্য আয়োজন করা হোক বিশেষ ‘ইন-সার্ভিস রিফ্রেসার কোর্স’। দেশের প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির বিশেষজ্ঞদের দিয়ে আধুনিক পেডাগজি (Pedagogy), শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং শিশু মনস্তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই কোর্স সফলভাবে শেষ করলেই তাকে টেট-এর সমতুল্য যোগ্যতা হিসেবে আইনি মান্যতা দেওয়া হোক। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ পারফরম্যান্স অডিটের পথে হাঁটা দরকার। ৩ ঘণ্টার একটা পরীক্ষা দিয়ে একজন শিক্ষকের দীর্ঘ পনেরো-কুড়ি বছরের নিষ্ঠা মাপা যায় না। তার চেয়ে স্কুলের সামগ্রিক রেজাল্ট, ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে শিক্ষকের গুণগত সমন্বয় এবং স্কুলের উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার উপর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ‘অভ্যন্তরীণ পারফরম্যান্স অডিট’ করা অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত ও সম্মানজনক।
বিখ্যাত শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে সতর্ক করেছিলেন শিক্ষার ‘ব্যাংকিং মডেল’ প্রসঙ্গে, যেখানে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে কেবল তথ্য জমা রাখার পাত্র মনে করা হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে ইন-সার্ভিস শিক্ষকদের ওপর এমসিকিউ-ধাঁচের টেটের প্রশ্নপত্র চাপিয়ে দেওয়া আসলে সেই যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিরই বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষাবিদ জন ডিউই-র ‘লার্নিং বাই ডুইং’ এর তত্ত্ব মেনে যাঁরা শ্রেণিকক্ষকে বছরের পর বছর সমৃদ্ধ করলেন, তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দেওয়াই আসলে প্রকৃত আধুনিকতা। শিক্ষা কোনো কর্পোরেট সেক্টর নয় যে কেবল যান্ত্রিক নিয়মের যাঁতাকলে ফেলে এর উৎকর্ষতা বিচার করা হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষকদের ক্ষুব্ধ, অপমানিত ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রেখে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার আলো পৌঁছানো অসম্ভব। ইন-সার্ভিস শিক্ষকদের সম্মান, অভিজ্ঞতা এবং আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে যদি একটি সুস্থ ও মানবিক ভারসাম্য না খোঁজা হয়, তবে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং শ্রেণিকক্ষগুলোই। আমলাতান্ত্রিক জেদ সরিয়ে এখন প্রয়োজন গঠনমূলক ও সহানুভূতিশীল পদক্ষেপের।