Shopping cart

  • Home
  • ফিচার
  • বর্ধমানের আলপনা গ্রাম লবণধার : এক অন্যরকম গল্প
ফিচার

বর্ধমানের আলপনা গ্রাম লবণধার : এক অন্যরকম গল্প

663

পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গলমহল বলে পরিচিত পূর্ব বর্ধমান জেলার আউসগ্রাম। একটা সময় এই অঞ্চল ছিল নকশালদের ঘাঁটি তবে সময় বদলেছে আউসগ্রামের হেক্টরের পর হেক্টর জঙ্গল জুড়ে প্রকৃতি এখন আপন খেয়ালে ব্যস্ত। আউসগ্রাম দুই নাম্বার ব্লকে জঙ্গল ঘেরা একটি ছোট্ট গ্রাম লবণধার। গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলে গেছে রাস্তা । রাস্তার দু’ধারে সারি সারি গাছ, বিস্তৃত অরণ্য। শাল, সেগুন , মহুয়া সহ আরো বহু ধরনের গাছ। অন্তত ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত সেই ঘন জঙ্গল পেরিয়ে ঢুকতে হবে গ্রামে। পথে পথে আত্মভোলা মন সেখানে নেচে ওঠে আদিম ইভার হৃৎকম্প খেলায়। মহূয়া গাছের – মাদকতা ছড়িয়ে রয়েছে রাস্তা জুড়ে। এ পথে ভালোভাবে দৃষ্টি দিলে আপনিও মাতাল হবেন । যেতে যেতে পথে পাবেন গাছে গাছে নানা রকম পাখির কিচির মিচির শব্দ । পথেই দেখা মিলতে পারে শিয়ালের। দেখতে পারেন গরুর গাড়িতে ধান বোঝাই করে, সেই গাড়ি চলেছে জঙ্গলের রাস্তা ধরে ধুলো উড়িয়ে। কপালে জুটে যেতে পারে একপাল গরু নিয়ে রাখাল চলেছে পথে পথে, সেই দৃশ্য দেখাও। সবমিলিয়ে অরণ্যের নিরব পরিবেশে এক অপার সৌন্দর্য বিরাজ করছে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে। প্রচুর ময়ূরের বসবাসস্থল এই জঙ্গল। ঝাঁকে ঝাঁকে ময়ূর দেখা সময়ের অপেক্ষা। ইদানিং জঙ্গলে নেকড়ের সংখ্যাও বেড়েছে। এখানে বড় বড় বাড়ি, দামাল হর্নের শব্দ পাবেন না। বরং আপনার কান জানান দেবে আপনি আছেন শহর থেকে অনেক দূরে প্রকৃতি রাজের আপন দেশে। এখানে প্রকৃতির নিয়মে আপনিও মুগ্ধ হবেন। এভাবেই আস্তে আস্তে এসে পড়বেন লবণধারে, এভাবেই এখানে গড়ে উঠেছে দেবশালা অঞ্চলের “বরডোবা” মৌজার লবণধার গ্রাম।


লোকের মুখে মুখে এই গ্রাম আবার আলপনা গ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করেছে । মূলত আদিবাসী গ্রামের দেওয়ালে বা জনজাতি অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে বেশ কিছু বাড়িতে দেখা যায় এরকম চিত্র বা ছবি। কিন্তু একটা গোটা গ্রাম বিভিন্ন চিত্র ও আলপনা দিয়ে সাজানো, তা আমাদের ভাবনারও অতীত । আর এই ভাবনাকেই দায়িত্ব নিয়ে সফল করেছে আলপনা গ্রাম বা লবণধার। আর সমগ্র দেওয়ালের চিত্র আঁকার পেছনে রয়েছে এক বৃহত্তর প্রেক্ষাপট যা শুনে হয়তো আপনিও বিস্মিত হবেন । লবণধার – এই নাম কে বা কারা দিয়েছেন সে কথা গ্রামবাসীদের কাছে অজানা থেকে গিয়েছে। তবে যুগ যুগ ধরে এই গ্রামের আদিবাসী রমণীদের সৌন্দর্যের প্রতি একটা আলাদা ভালোবাসা রয়েছে । শত দুঃখ কষ্টে বা অভাবের মধ্যেও যা তারা কোনদিনও ভোলেননি। তারা নিজেরা যেমন সাজতে ভালবাসেন তেমনি তাদের গৃহস্থালির মধ্যেও সেই সৌন্দর্য ধরা পড়ে ।


চর্যাপদের যুগ থেকে শুরু করে এই আধুনিক যুগেও তারা সেই ধারা বজায় রেখেছে। লবণধার গ্রামের প্রায় প্রতিটি আদিবাসী বাড়িতে সেই চিহ্ন ধরা পড়ে। মনসা মন্দিরে যেমন আছে সাপের চিত্র , তেমনি কোথাও আছে রাধা কৃষ্ণের মূর্তি। কোথাও আবার দেওয়াল জুড়ে পশু পাখি , মাছ ইত্যাদি বহু উপকরণ। কথিত আছে প্রায় ৩০০ বছর আগে ডাকাতের উৎপাত থেকে বাঁচতে বড়ডোবার রায় বাড়ির সদস্যরা অন্যত্র নতুন বসবাসযোগ্য বসতির সন্ধান করছিলেন। এর জন্য তারা একটি পাখি ওড়ান এবং মনস্থির করেন এই পাখি যেখানে গিয়ে বসবে সেখানেই তারা বসবাস করবেন। পাখিটি লবণধার গ্রামের ধর্মরাজ তলার একটি বড় বট গাছে এসে বসে। পূর্ব নির্ধারিত মত অনুযায়ী তাই সেখানেই বসতি স্থাপন হয়। প্রথমে গ্রামের নাম দেয়া হয় নতুন গ্রাম । কিন্তু পরে দেখা যায় আশেপাশে আরও নতুন গ্ৰাম আছে। তাই বিভ্রান্তি এড়াতে নাম দেওয়া হয় নবনধার। কালক্রমে সেটি পরিচিত হয় লবনধার নামে। বর্তমানে এটি আলপনা গ্রাম নামে খ্যাত। অনেক আবার বলেন নকশাল আমলে গড়ে ওঠা গ্রাম হল লবণধার। বহু প্রাচীন এই গ্রামটি গড়ে ওঠা সম্বন্ধে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন ধারণা আছে। তবে গ্রামটির কিছু পুরনো মন্দিরের টেরাকোটার কাজ – এই ধারণাকে আরো দৃঢ় করে যে গ্রামটি বহু প্রাচীন অর্থাৎ ২০০ বছরেরও বেশি পুরনো।

লবণধারের আলপনা গ্রাম হয়ে ওঠার গল্প আকর্ষণীয়। প্রকৃতি যেমন সুন্দর তেমনি প্রকৃতির কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ খুবই ভয়ংকর । আর তাদের হিংস্রতা এতটাই তীব্র যে অপরূপ প্রকৃতিও তার কাছে বাদ যায় না। প্রায়ই আগুন লাগে জঙ্গলে। জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট গ্রামের পরিবেশে তখন তীব্র ধোঁয়ার বীভৎস গন্ধ। মূলত কিছু অসচেতন মানুষ ও জঙ্গলের চোরা শিকারীরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মাঝেমধ্যেই আগুন লাগায়। গ্রামের অনেকেই জঙ্গলে বিভিন্ন কাজে গিয়ে পাতায় আগুন লাগিয়ে দেয় অথবা অন্যমনস্ক হয়ে কোন দাহ্য পদার্থ ফেলে আসে এতে মাঝেমধ্যেই আগুন লেগে যায় জঙ্গলে।


জঙ্গলে আগুন লাগানো উচিত নয়, তা মোটেও কাম্য নয় – বাকি সব্বাইকে এই পাঠ দিতেই গ্রামের কয়েকজন মিলে তৈরি করেন একটি সংগঠন। প্রথমে সাধারণ মানুষদের মধ্যে বনসৃজন, জঙ্গল সংরক্ষণের প্রচার, বন রক্ষার জন্য বিভিন্ন চিত্র আঁকা হয় গ্ৰামের কিছু দেওয়াল ও স্থানীয় একটি মন্দিরের দেওয়ালে । এবং গ্রামের মানুষজনকে বোঝানো হয় জঙ্গল ও প্রকৃতি রক্ষার বিভিন্ন দিক । এরপর আর ঘুরে তাকাতে হয়নি, জঙ্গল রক্ষার পথ চলতে গিয়েই বৈচিত্র্যময় শিল্পী ও শিল্প সত্তার আবির্ভাব ঘটে গোটা গ্রাম জুড়ে। গ্রামের প্রায় প্রত্যেকেই নিজেদের বাড়ির দেওয়ালে অঙ্কনের অনুমতি দেন। দেওয়ালে দেওয়ালে ছবি এঁকে প্রচার শুরু হয় গোটা গ্রাম জুড়ে। কিছুদিনের এই প্রচেষ্টায় তারা অধিকাংশ গ্রামের দেওয়ালে নানান ছবি এঁকে ফেলেন। সেই ছবিতে ধরা আছে জঙ্গলের পরিবেশ, আদিবাসী সমাজের পরিবেশ, তাদের সংস্কৃতি, কোথাও পৌরাণিক কাহিনী তো কোথাও আবার নানান দেব দেবীর কথা। এভাবে সেজে উঠেছে সমগ্র গ্রাম। অর্থাৎ বলাই বাহুল্য গাছ রক্ষার তাগিদ ও সচেতনতার যাত্রাই এনে দিয়েছে শিল্পের সূত্রপাত । শুধু তাই নয় স্থানীয় মানুষদের ছেলেমেয়েদেরকে সাংস্কৃতিক মনস্ক করে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি আরো একটি উদ্যোগ নেয়। তারা কিছুদিন অন্তর অন্তর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গ্রামের মানুষদের প্রকৃতি সচেতনতার পাঠ থেকে শুরু করে গ্রামের ছেলেমেয়েদের সংস্কৃতি মনস্ক ও শিল্প সত্তার বিভিন্ন দিক শেখানোর জন্য সংস্থাটি আয়োজন করে চিত্র আঁকার কর্মশালা। এবং উল্লেখযোগ্য কর্মশালায় আসেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চিত্রশিল্পী। ভারতের কেরল, ঝাড়খণ্ডের মতন রাজ্য থেকে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে লবণধারে আসেন বিভিন্ন চিত্রশিল্পী। নতুনভাবে দেওয়ালগুলো সেজে ওঠে গোটা গ্রামের। গ্রামের সমস্ত মানুষকে কর্মশালায় ডাকা হয়। ছবি আঁকতে ব্যবহার করা হয় প্রাকৃতিক রং। হাতে-কলমে শিক্ষা অর্জন করে সমগ্র গ্রামবাসী সহ বিভিন্ন শিল্পী মনস্ক মানুষ। ছবি আঁকতে প্রাকৃতিক রং তৈরি করার চল ছিল একটা সময়। তবে সময়ের অভাবে বাজারের প্লাস্টিক রং বর্তমানে ব্যবহার হলেও প্রকৃতির ভারসাম্যের কথা মাথায় রেখে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হয় প্রাকৃতিক রং। লবণধারকে সাজাতে প্রচুর রঙের প্রয়োজন হয়। আগেই বলেছি গোটা গ্রামে দেওয়াল জুড়ে ছবি আঁকতে ব্যবহার হয় প্রাকৃতিক রং। তাই গ্রামের ছেলে, মেয়েরা নিজের হাতে তৈরি করে প্রাকৃতিক রং, যা তারা বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে শিখেছে। খড়িমাটি ভিজিয়ে তৈরি করা হয় লাল রং । আতপ চালের গুরো দিয়ে সাদা রং। আলপনা আকার রং তৈরি করতে ব্যবহার করা হয় শুকনো বরই, আমের আঁটির শাঁস চূর্ণ। গিরিমাটি, মান কচু, কলা গাছের আঠার সাথে নানা রঙের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি হয় আরো নানা ধরনের রং।

অন্যদিকে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার লবণধার হল অন্য শিল্প গ্রামের থেকে ভিন্ন। আলপনা হল মানব সভ্যতার লোকচিত্রকলা। এই লোকশিল্পকে যুগ যুগ ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে প্রধানত গ্রামের মহিলারা। তাদের অঙ্কন শৈলীর মাধ্যমে আলপনায় সাজিয়ে তোলেন নিজেদের বাড়িগুলি। তবে একটু ব্যতিক্রম লবণধার গ্রাম। এখানে প্রথমে ছবি আঁকা শুরু হয়েছে সচেতনতার উদ্দেশ্যে। প্রতিটি দেয়াল বা ঘরের কোনে যেন এক একটি ক্যানভাস। আর এই ক্যানভাসে ভরা গ্রামটিতে এসে ভালো করে চোখ দিয়ে প্রত্যক্ষ করলেই বুঝতে পারবেন বাকি চারটি আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামের থেকে আউসগ্রামের লবণধার সম্পূর্ণ ভিন্ন ও গভীর অর্থবাহক। কারন এখানে শুধুমাত্র ছবি আঁকার জন্য গ্রামটির দেওয়াল অথবা গোটা গ্রামটিকে সুন্দর করে সাজানো হয়নি। বরং আসল কথা এই যে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল গাছ বাঁচানো, জঙ্গল বাঁচানো এবং সর্বোপরি প্রকৃতি রক্ষা। তাই তারা সমগ্র গ্রামের মানুষ শুধু নয়, আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষদেরকে সচেতন করতে বাইরে থেকে বিভিন্ন চিত্রশিল্পী নিয়ে এসে নিজেদের অর্থ খরচ করে গ্রামের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রকৃতি রক্ষার বিভিন্ন ধরনের ছবি তুলে ধরেন, জঙ্গল সংলগ্ন মানুষদেরকে নিয়ে অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্প থেকে শুরু করে জঙ্গল রক্ষার্থে সাইকেল র‍্যালি, জঙ্গলের ফরেস্ট অফিসারদের সাথে নিত্যনৈমিত্তিক যোগাযোগ রেখে জঙ্গল রক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ সহ একগুচ্ছ কর্মকাণ্ড করেন। আর মানুষও সাড়া দিয়ে সচেতন হন, আস্তে আস্তে সেই দেওয়াল চিত্রই ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র গ্রাম জুড়ে। আর প্রকৃতি রক্ষার সচেতনতা বার্তা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র অঞ্চলজুড়ে। মানুষ তীব্র সচেতন হন। লবণধার তাই প্রকৃতির রক্ষার সুপ্ত দিগন্তে শিল্পের মুক্ত ক্যানভাস। আসলে গাছ রক্ষার তাগিদের ভাবনা আজ গ্রামে নিয়ে এসেছে স্বীকৃতি ও পর্যটক। লবণধার বার্তা দেয় এ পৃথিবীটা আমাদের, আমাদেরই তা রক্ষা করতে হবে। গাছ রক্ষা করতে হবে। আর শিল্প সত্ত্বাও ।

লবণধারে কাটাতে পারেন আপনার আনন্দের কিছু সময়। কিন্তু আপনি যদি হাতে সময় নিয়ে আসেন এবং আরও কিছু জায়গা ঘুরতে চান তবে নিরাশ করবে না আউশগ্রামের এই বিস্তীর্ণ জঙ্গলমহল। আশেপাশের তাই কিছু সাইট সিন বলা রইলো এখানে। উল্লেখযোগ্য সাইট সিন গুলো ভালোভাবে ঘুরতে পারবেন যদি আপনি নিজস্ব গাড়ি অথবা ভাড়া করা গাড়িতে আসেন। কারণ এ পথে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পাওয়া খুবই সময় সাপেক্ষ। লবনধারের কাছেই আছে আউসগ্রামের জঙ্গলে মোরা শ্যামরূপা মন্দির, দেউল পার্ , ভালকি মাচান, আউসগ্রামের বিস্তীর্ণ জঙ্গল, বাউল পার্ক এর মতো জায়গা, দিগনগরের জল টঙ্গী, কালিকাপুর রাজবাড়ী, তেপান্তর থিয়েটার ভিলেজ, পৃথিবী প্রসিদ্ধ দারিয়াপুরের ডোকরা শিল্প, মানকরের সাবেকি দুই বাড়ি- কবিরাজ ও বিশ্বাস বাড়ি। সময় থাকলে ঘুরে নিতে পারেন গুসকরার লক্ষীগঞ্জ ও যাদবগঞ্জের মতো আদিবাসী গ্রাম ও ফরেস্ট। গুসকরা রটন্তী কালীমন্দির, গুসকরা জমিদার বাড়ি। এবং এ পথেই চলে যেতে পারেন গুসকরা থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত শান্তিনিকেতনে।

বর্তমান যুগে লবণধার সত্যিই এক বার্তাবহ গ্রাম , যেখান থেকে শক্তি নিয়ে বাড়ি ফেরা যায়। চেতনার পাঠ নেওয়া যায়। শহরের বিষবাষ্প যখন আপনার গলা টিপে ধরে, তখন লবণধার অক্সিজেনে ভরিয়ে দেয় চারিপাশ। এখন অনেক পর্যটকই আসছেন এই লবণধারে। আগে সেভাবে কোনো পরিকাঠামো ছিল না, স্থানীয় সংগঠনটি বর্তমানে এই অঞ্চলে নিজেদের অর্থ খরচ করে পর্যটকদের জন্য হোমস্টে এবং খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু তা ও অল্পই, আসলে পূর্ব বর্ধমানের এই জঙ্গল অধ্যুষিত গ্রাম জেলা তথা রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করতে পারে অনায়াসেই। কিন্তু দুঃখের কথা এই যে -জেলা পর্যটন ও রাজ্য পর্যটন বিভাগের সেভাবে কোনো উদ্যোগ দেখা না যাওয়ায় আজও অনেক প্রকৃতি প্রেমীর কাছে অচেনা লবণধার। এক কথায় এগিয়ে বাংলার পর্যটন মানচিত্রে লবণধার তাই এখনো অনেকটা পিছিয়ে, যা আসলে আমাদেরই ঐতিহ্যের ক্ষতি।

আগামী দিনে পর্যটন বিভাগের সহায়তা পাবে লবণধার এই আশা রাখি। লবণধারের প্রত্যেকটি মানুষের বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার, অ-ব্যবসায়িক মানসিকতা, এবং তাদের জীবনযাপন আপামোর পর্যটকদের ভালো লাগতে বাধ্য তা এক বাক্যে কথা দেওয়াই যায়।

পথে পথে আত্মভোলা মন সেখানে নেচে ওঠে আদিম এক ছন্দে। মহুয়া গাছের মাদকতা ছড়িয়ে রয়েছে রাস্তা জুড়ে। এ পথে দৃষ্টি দিলে আপনিও মাতাল হবেন। যেতে যেতে কানে আসবে হরেক পাখির কিচিরমিচির। পথে দেখা মিলতে পারে শিয়ালের। চোখে পড়বে গরুর গাড়িতে ধান বোঝাই করে ধুলো উড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য, কিংবা রাখালের গরু নিয়ে পথচলা। সব মিলিয়ে অরণ্যের নীরব পরিবেশে এক অপার সৌন্দর্য বিরাজ করছে। প্রচুর ময়ূরের পাশাপাশি ইদানিং জঙ্গলে নেকড়ের সংখ্যাও বেড়েছে। এখানে বড় বড় বাড়ি বা দামাল হর্নের শব্দ নেই; বরং আপনার কান জানান দেবে আপনি শহর থেকে অনেক দূরে প্রকৃতির রাজ্যে আছেন।

এভাবেই গড়ে উঠেছে দেবশালা অঞ্চলের “বরডোবা” মৌজার লবণধার গ্রাম। লোকের মুখে মুখে এই গ্রাম এখন ‘আলপনা গ্রাম’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। মূলত আদিবাসী গ্রামগুলোতে দেওয়ালে চিত্র দেখা গেলেও, একটি গোটা গ্রাম এভাবে আলপনা দিয়ে সাজানো—তা আমাদের ভাবনার অতীত। আর এই ভাবনাকেই সফল করেছে লবণধার।

সম্পর্কিত খবর