মফস্বলের মাটি মাতিয়ে রাখে ঘর
এক থেকে চার, কার কাঁধে ভর?
আমার ছোটবেলা, আমার একার যাদবপুর…
সময় যায়, মানুষ যায়, আলোও যায়! কিচ্ছু থাকে না হাতে। ফিরে তাকাতে অজুহাত লাগে— নেই! নেপালদা অজুহাত রেখে দিয়েছে…
যে দাদা ‘যাদবপুরের গান’ লিখেছিল, সে জানত মানুষ মিশে যায়, থেকে যায় না! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি এখন, দূরের গাঁয়ের বন্ধু এলে কেউ— জিগাই, শুধাই আলোর খবর রোজ। মানুষ যখন সহজ-সরল আছেই, এইটুকু শুধাতে কী দোষ!
মূলত গ্রাম-মফস্বল-শহর মিলে যাদবপুর। আমাদের মাস্টারমশাই বলতেন, আমরা সবাই নিজেদের একটুকরো শহর/গ্রাম/মফস্বল নিয়ে এসেছি ঠিকই, কিন্তু ফেরার সময় নিয়ে ফিরব অনেকটা যাদবপুর! বুঝিনি তখন। আলোর মতো মাস্টারমশাইয়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলাম। আরেক মাস্টারমশাই শেখালেন ‘জীবন’— সে কী জীবন!
এক শীতকালের হুহু হাওয়ায় ‘চার’ দিয়ে প্রথম যাদবপুর ঢুকি; সামন্ত গোটা ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে শেষে চা খাইয়েছিল! তারপর মেস। এই মেস যে কী জিনিস, অন্য কোনোদিন লিখব’খন!
জানি না, আপনি— হ্যাঁ আপনি যিনি পড়ছেন, তিনি এটা কোনোদিন অনুভব করতে পারবেন কি না! কিন্তু জানেন, এই ক্যাম্পাসের প্রত্যেকটা ঋতুর আলাদা ফ্লেভার আছে। বর্ষাকাল এলেই বাপনদার গাওয়া আর শুভদার ভিডিয়োটার কথা মনে পড়ে যায় “সাজনা বরসে হ্যায় কিউঁ আঁখিয়া”। গোটা ক্যাম্পাস জলের তলায় প্রায়, নৌকা ভাসছে, গান গাইছে দূরে কেউ, কাছে কেউ, পাশেও কেউ! পরে কোনোদিন দেখাব সেই ভিডিয়ো। গরমের বিকেলে খোলা মাঠ, শীতের সন্ধ্যা, বসন্তের পাতাঝরা। পুরোনো ইউনিয়ন রুমে সারাদিন ক্যারম আর টেবিল-টেনিসের গল্প— আসলেই গল্প হয়ে গেছে!
হঠাৎ ওঠা কালবৈশাখী মনে একটা প্রেম-প্রেম ব্যাপার তো তৈরি করত! এবার আমি কালবৈশাখী দেখে প্রেম কেন আসত, ফিগার আউট করে উঠতে পারিনি— প্লিজ জাজ মি! তবে মেঘ করলে আমি আলো হয়ে যেতাম। একটা চুপ করে যাওয়া আলো! একটা বন্ধু সারাদিন সাথে সাথে আছে— ক্লাস থেকে OAT, OAT থেকে গ্রিনজোন, তারপর সোজা মধুপুরের ছাদে! আমি ওয়ার্ল্ডভিউকে মধুপুর বলতাম, কারণ ওরকম সহজ ছাদ আর কটাই বা আছে বলুন! ওখানকার দরজাটার নাম ‘ভালোবাসা’ দিলুম…
বৃষ্টি পড়লেই কয়েকজন লিফলেট দিয়ে নৌকা বানাত। সেই নৌকা ভেসে যেত দূরের কোনো মনে। আমি চেয়ে থাকতাম। ঠিক তখনই একটা বাইক নৌকার পাশের জলটাকে পুরো উথাল-পাথাল করে দিয়ে চলে যেত, মন ডুবে যেত অন্য কোনো মনে। অনেক বৃষ্টি হলে প্যান্ট হাঁটুর ওপর তুলে হেঁটে ‘এক’-এর দিকে যেতাম। যারা বলেন যাদবপুরের গায়ে অন্ধকার আছে, তাদের জন্য একটা আলোর নৌকা দিলুম!
এক গরমের বিকেলে চা খাচ্ছি জয়দেবদার দোকানে। দুজন পাশে এসে বসে হঠাৎ ইংরেজিতে বলল, সব কিছু নাকি চেঞ্জ হয়ে গেছে, আগের মতো কিছু নেই! আমি ভাবলাম এভাবেই কি মানুষ নিজের না-পাওয়াগুলোকে পরিবর্তনের নাম দেয়? কে জানে…
এখন টিভি খুললেই মানুষ কাউকে না কাউকে ছোট করবে বলে চোয়াল শক্ত করছে, কিছু একটা বলে যদি একটুও ছোট করে দেওয়া যায়, এতে কম কী! আর তারপর যদি নাম আসে যাদবপুরের, তাহলে তো কথাই নেই! তবে সত্যি বলতে আমার মজাই হয়, মানুষকে কিছু একটা তো যাদবপুর দেয়ই— ওদের একটু অভিমানই না হয় দিল, ক্ষতি কী!
পরে আরেকদিন মন খুলে বসব আপনাদের কাছে, অনেক কথা বাকি রয়ে গেল, অনেক মানুষ খোলা বাকি রয়ে গেল।গেলাম, চারটে লাইন দিয়ে গেলাম…
চারের গেটে জানলা কেটে
ফিরতি কিছু চোখের পানি
আবার কিছু নরম মন
যাদবপুরেই ফিরবে জানি…










