ভোটের অঙ্কে প্রতিনিধি অথচ বাজেটে শূন্য, আইনি স্বীকৃতিহীন ৮ কোটি শ্রম!

২২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

‘ওরা চিরকাল/ টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল/ ওরা মাঠে মাঠে বীজ বোনে/ পাকা ধান কাটে/ ওরা কাজ করে/ নগরে প্রান্তরে।’

কবিগুরু এই লাইনগুলি যখন লিখেছিলেন, তখন তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, দিন আসবে, দিন যাবে, রাজা আসবে, রাজা যাবে, কিন্তু সর্বহারারা যে মুলুকে ছিলেন, সেই মুলুকেই বরাবর থেকে যাবেন। এই যেমন ধরুন, আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠলেন এক কাপ ধোঁয়া ওঠা বেড টিতে চুমুক দিয়ে। তারপর গেলেন মর্নিং ওয়াকে। এসে ব্রেকফাস্ট সেরেই টুক করে হাতে টিফিনবাক্স ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অফিসে। চা’টা, ব্রেকফাস্ট’টা, টিফিন’টা কোনও কিছুরই টেনশন নিতে হল না, ভাবতে হল না ঘরটা কে মুছবে, বাসনটা কে মাজবে বা আগের দিনের বাসি জামাকাপড়গুলো কে কাচবে। কারণ, আপনার একটা ভরসার কাঁধ আছে। আপনার বাড়ির গৃহপরিচারিকা সবটা সামলে নেবেন। আর সেই ‘মাসি’, ‘কাকিমা’ বা ‘জ্যেঠিমা’ ছুটি নিলেই মাথায় হাত পড়ে যায়। কখন কী করবেন যখন ভেবে কুল পান না, তখন একটু ভেবে দেখতেই হয় যে, সামাজিক কোনো সুরক্ষা ছাড়া, স্থায়ীকরণের কোনো আশ্বাস ছাড়া কীভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে এই গৃহশ্রমিকরা কয়েকটা হাতে গোনা পয়সার বিনিময়ে নিজেদের শ্রমটুকু বিকিয়ে যাচ্ছেন। ন্যূনতম সম্মানটুকুও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা পান না। আর এদিকে তাঁদেরই প্রতিনিধি কলিতা মাজিকে বিধানসভায় প্রতিমন্ত্রী রূপে পাঠালো কেন্দ্রীয় সরকার।

কিন্তু বহু প্রতীক্ষিত বাজেটে একটি পয়সাও বরাদ্দ ধার্য করা হল না পরিচারিকাদের। এমনকি তাঁদের গৃহশ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ তৈরি করে অনিয়ন্ত্রিত প্লেসমেন্ট এজেন্সি এবং আয়া সেন্টারগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার যে বরাবরের দাবি, তাও পূর্ণতা পেল না। আউশগ্রামের বিধায়িকাকে যখন একটি জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম এই বিষয়ে প্রশ্ন করছে, তখন তিনিও বেশ সুকৌশলে প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়েছেন। বলেছেন, ‘সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পেও তো বরাদ্দ বাড়ল। সেটা কম নাকি?’

তথ্য বলছে, ভারতে ১০ জন গৃহশ্রমিকের ৯ জনই মহিলা। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৮ কোটি গৃহশ্রমিক থাকা সত্ত্বেও সেই পেশা এখনও মান্যতা পায়নি আইনিভাবে। কেরল, তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার মতো একাধিক রাজ্যে গৃহশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা হলেও এ রাজ্যে এখনও পর্যন্ত সরকার এই বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ করেনি। ইউনিয়নে যুক্ত শ্রমিক না হওয়ায় শ্রম দফতরও তাঁদের কোনো অভিযোগে সাড়া দেয় না। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ই-শ্রম পোর্টালে যে রাজ্যের ৫২ লক্ষ গৃহশ্রমিকের নাম নথিভুক্ত রয়েছে, সেই রাজ্যে গৃহপরিচারিকাদের শ্রম ‘শ্রম’ হিসেবেই আখ্যা পায়নি। আন্দোলনের পর আন্দোলন করে গিয়েছেন ঢাকুরিয়া, পার্ক সার্কাস, বালিগঞ্জের মতো রেলবস্তিতে মাথা গুঁজে ঠাঁই পাওয়া হাজারো শ্রমিক। লাভ হয়নি। কাজের সময় লিখিত চুক্তি না থাকায় কোনও মালিক কাজ করিয়েও টাকা দেননি, কেউ আবার প্রতিশ্রুতিমাফিক বেতনটা হাতে তুলে দেননি। কোথাও তাঁরা যৌন হেনস্থার শিকার, কোথাও আবার কাজের পরিমাণ বেড়ে গেলেও বেতন বাড়েনি বছরের পর বছর। তার ওপর সঙ্গী হয়েছে ‘ঝি’ আখ্যায় অপমান, ‘চোর’ অপবাদ, বাথরুম ব্যবহার না করার নিদান, পুজোর ‘বোনাস’ চাইলে কুব্যবহার কিংবা হরেক রকম হয়রানি। স্বীকৃতি না মেলায় অভিযোগ জানাতে পুলিশে গিয়েও লাভ হয় না।

মরার ওপর খাঁড়ার ঘা আবার রেলবস্তি এবং হকার উচ্ছেদ। কলকাতা সহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলির রেলবস্তিতেই বাস অধিকাংশ পরিচারিকার। কারোর স্বামী, পরিবার দু’মুঠো অন্ন জোগাতে হকারি করতেন স্টেশনে। তাঁরা এখন সবাই বেকার। দু’দিন পরে মাথার ছাদটুকু থাকবে কিনা, সেটাও এখন ধোঁয়াশায়।

ঢাকুরিয়া রেলবস্তিতে বসে এসব নিয়েই কথাই হচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি’র সদস্য স্বপ্না ত্রিপাঠীর সঙ্গে। স্বপ্না বলেন, ‘ভারত সরকারের শ্রমবিধিতে বলা হয়েছে, কোনও বাড়িতে পাঁচজন গৃহশ্রমিক কাজ করলে তবেই মজুরি সহ আইনের অন্যান্য সুযোগসুবিধা পাওয়া সম্ভব। আমাদের রাজ্যে এত বড়লোক কেউ নেই যে, বাড়িতে পাঁচজন করে পরিচারিকা রাখবেন। আমরা আগের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এবং শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটককে চিঠি দিয়েছিলাম বেশ কয়েকবার। উত্তর পাইনি। বহু মন্ত্রী এও বলেছেন, আমাদের দাবি পূরণ করলে তাঁদের নিজেদের বাড়ির গৃহিণীরাও রেগে যাবেন। ২০১৮ সালে অনেক চেষ্টার পর একটি ইউনিয়ন নথিভুক্ত করা গিয়েছিল ঠিকই, তবে সেটার আর নবীকরণ করা হচ্ছে না। এই নিয়ে এখন আইনি লড়াই চলছে। ন্যূনতম মজুরি ঠিক করার জন্য শ্রম কমিশনের অধীনে একটি কমিটিও তৈরি করানো গিয়েছিল। ঘণ্টা-প্রতি মজুরি নির্ধারণ করার প্রক্রিয়াও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার পরে আর কিছুই হয়নি। ভেবেছিলাম সরকার বদল হলে সুরাহা মিলবে। কিন্তু বাজেটে একটা কথাও ব্যয় করা হল না।’

একই আক্ষেপ ঝর্ণা, মিনু, কুসুমদেরও। বাচ্চাদের বাড়িতে রেখেই রোজ লক্ষ্মীকান্তপুর, হোঁটর, ডায়মন্ডহারবার থেকে ট্রেনে ঝুলে ঝুলে কাজে আসতে হয় তাঁদের। তাঁদের দীর্ঘদিনের একটা সরকারি ক্রেশের দাবি পূরণ করেনি রাজ্য। না আছে পেনশনের সুবিধা, ইএসআই, মাতৃত্বকালীন সবেতন ছুটি বা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা। বাবুরা অসুস্থ হলে পান পিএল, সিএল। আর পরিচারিকারা অসুস্থ হয়ে কাজে আসতে না পারলে কাটা যায় বেতন। অনেক জায়গায় অবশ্য এই অভিযোগও আছে যে, সপ্তাহের অর্ধেক দিন ‘ডুব মারেন’ গৃহপরিচারিকারা। চাহিদার সুযোগে বেশি মজুরি চান অনেকেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, রাজ্য সরকার যদি একটি ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার অনুমতিই না দেন, তাহলে এই অভিযোগগুলিই বা পর্যালোচনা করবেন কে? অন্নপূর্ণা ভান্ডার, আয়ুষ্মান ভারতের মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির সুবিধা নিতে গেলেও বিপুল সাধারণ মানুষদের ভিড়ে রোজ তালিকায় মিশে যেতে হয় গৃহপরিচারিকাদের। অনেকসময় এইসবের লাইনে দাঁড়িয়েই দিন কাবার হয়ে যায়। বাড়ে অনুপস্থিতির হার। তখন ফের বেতন কাটা যায় তাঁদের। এই অসুবিধার কথা মাথায় রেখে আলাদা করে তাঁদের পরিষেবা দেওয়ার কথা কেনই বা ভাবছে না সরকার? এসআইআরে যে বিপুল সংখ্যক পরিচারিকার নাম বাদ গিয়েছে, পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও যাঁদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে পুশব্যাক করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তাঁদেরই বা ভবিষ্যৎ কি?

প্রশ্ন অনেক। উত্তর নেই। দেশ ঘোরে যাঁদের চাকায়, তাঁদের সুরক্ষা কি দেশ দেবে? অন্তত নারী হওয়ার সুবাদেও কি তাঁরা শৌচালয় ব্যবহারটুকুর সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন? তাঁদের জন্য পুলিশ নেই, প্রশাসন নেই, সাধারণ মানুষ নেই, অতীত নেই, বর্তমান নেই, ভবিষ্যৎও নেই। মালিকের হুকুম মেনে সবটা যোগান দেওয়া তাঁদের অন্ন দায়। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হয়তো ঠিকই লিখে গিয়েছিলেন, ‘রাজা আসে যায় রাজা বদলায়/ নীল জামা গায় লাল জামা গায়/ এই রাজা আসে ওই রাজা যায়/ জামা কাপড়ের রং বদলায়/ দিন বদলায় না!’

অন্যান্য প্রতিবেদন.