সেই কত বছর আগে প্রতুল মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘আমি বাংলায় হাসি, বাংলায় ভাসি, বাংলায় জেগে রই’। আমরাও সে জুতোয় পা গলিয়েছি অজান্তে। দুঃখ বেড়েছে আমার ওই ভাষাতেই। রিফিউজি কলোনিতে জন্মের পর জেনে গিয়েছি বাংলা ভাষায় কথা বলা মানুষের গত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ দুঃখের নাম ‘দেশভাগ’। যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ২০ লক্ষ মানুষ। যাতে শেষ হয়েছে ফতেমা চাচির সঙ্গে সন্ধ্যারানি মণ্ডলের বন্ধুত্ব আর চেনা বিকেলে সুখ-দুঃখের পুকুরঘাট।

তারপর হঠাৎ এই সিনেমাটা দেখতে পাওয়া। সেই মধ্যরাতের সেলুলয়েড আমায় নিয়ে যায় জসীমউদ্দীনের নকশি কাঁথার মাঠে। যেখানে মনিরুলের সঙ্গে ইন্দুবালার প্রেম হতো। রূপাই সাজু দেখতে যেতো কপোতাক্ষ নদীর পুবের ঘাট।

ইমতিয়াজ আলী সম্ভবত বুঝিয়ে দিলেন, ২০২৬ সালের হিংসার হিন্দুস্তানে দেশভাগের গল্প বলতে গেলে বেঙ্গল ফাইলস-এর মতো ঘৃণার ছবি বানাতে হয় না। ভালোবাসার চিত্রপটেই বোনা যায় ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’।

আমি ফিল্ম সমালোচক নই। আমি বিশ্বাস করি ‘সিনেমা’ আলু, পটল কিংবা ডেনিম নয়। তাই সংবাদপত্রের পাতায়, মোবাইলের স্ক্রিনে সিনেমার সমালোচনা করা যায় না। উদ্বাস্তু জীবন, দেশভাগ নিয়ে যিনি এই মহাবিশ্বের অমোঘ সব সিনেমা বানিয়েছেন, সেই ঋত্বিক ঘটক আমায় (পড়ুন আমাদের সবাইকে) দেখতে শিখিয়েছেন—বাংলায়, পাঞ্জাবে, শ্রীলঙ্কায়, লাহোরে, প্যালেস্টাইনে কিংবা পোল্যান্ড থেকে পালিয়ে আসা আমেরিকার ঘিঞ্জি গলিপথে যাঁরা ‘কী যেন এক অজ্ঞাত কারণে’ দেশ হারিয়েছেন, তাঁরা সবাই আমার লোক। তাঁদের সবার লাল-হলুদ জার্সির পেছনে লেখা ‘রিফিউজি’। একটা ‘মেঘে ঢাকা তারা’, একটা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘দ্য ইমিগ্রেন্ট’ কিংবা আজকের ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ দেখলে, আদতে ঋত্বিকের ভাষায় ‘গ্রাম পতনের শব্দ হয়’। ইমতিয়াজের এই ১৬৭ মিনিটের সিনেমা যেন এক ভাঙা মন্দিরে গুপ্তধনের খোঁজ। যেখানে ধর্মীয় ভাবাবেগের উসকানি নেই, ইতিহাসের বিকৃতি নেই। রাজনীতির কবর খোঁড়ার সুস্পষ্ট কোনো ষড়যন্ত্র নেই। আছে নিজের প্রেমিকাকে শেষবার দেখার, শেষ চিঠি পৌঁছে দেওয়ার এক অমোঘ আর্তনাদ। ইমতিয়াজ কি পারলেন, আর বিবেক অগ্নিহোত্রীরা হারলেন? জানি না।

দিল্লি থেকে লাহোরের দূরত্ব আর কত? বড়জোর সাত-আট ঘণ্টা! কলকাতা থেকে জলপাইগুড়ি পৌঁছনোর আগেই পৌঁছে যাওয়া যায় ইমরান খানের দেশে। চেখে দেখা যায় ‘আলি হজভেরির কাবাব’। অশীতিপর নাসিরুদ্দিন শাহ তাই ভুলে যান সাতচল্লিশ সাল—ভিড় ট্রেনে কোনো রকমে পৌঁছনো সে-রাতের অমৃতসর জংশন। শুধু হাতের কবজিতে রয়ে যায় ‘মল্লিকা দিলফারেব’ নামের একটা মেয়ে, যাঁকে জিয়া নামে ডাকতেন তিনি ছেলেবেলায়।
কয়েক বছর একটা বাড়িতে ঘরভাড়া থাকবার পর নতুন বাড়িতে গেলেই আমাদের মন খারাপ হয়, আর যাঁদের একটা গোটা দেশ চলে গিয়েছিল, যাঁদের হারিয়ে গিয়েছিল নিজেদের মহল্লা, চায়ের দোকান, পুরোনো চার্চ, স্কুল-কলেজ, গলিরাস্তা, প্রেম, মামাবাড়ি দেখতে যাওয়ার আনন্দ, তাঁদের মনের উপর দিয়ে কী গিয়েছিল একবার ভাবুন! আমরা এতগুলো বছর ধরে দেশভাগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শুধুই রাজনীতির কথা বললাম। তৈরি হলো বেঙ্গল ফাইলস। আর একটু ঘৃণার চাষ হলো বসিরহাট থেকে ওদলাবাড়ি। তবু আমরা ভেবে দেখলাম না সেই ফলসা গাছটার কথা, যাকে মা বিয়ের পর উঠোনের পশ্চিমে বসিয়েছিলে। কিংবা সেই পোস্টমাস্টার জাহিদুল রহমান, যাঁর চিঠিতে বাবার চাকরি হয়েছিল। সেই শেষ ট্রেনের ড্রাইভার যিনি পেরিয়েছিলেন লাহোর থেকে দিল্লি শেষবারের মতো। সেই সব প্রেম যাদের গল্পটা চিনু আর জিয়ার মতোই কালের নিয়মে শেষ হয়ে গিয়েছে। হয়তোবা তারই একটা খুঁজলেন ইমতিয়াজ আলী!

সিনেমা শেষ করে দীর্ঘক্ষণ ভেবে চলেছি, ‘আচ্ছা কার দোষ বলুন তো’? গান্ধীর? শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির? মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর? নেহরুর? কমিউনিস্ট পার্টির? সোহরাবর্দির? লিয়াকত আলী খানের? কার?—উত্তর মেলে না। প্রথমে কুড়ি লক্ষ, তারপর স্বাধীনতার এতগুলো দশক পেরিয়েও ধর্মীয় দাঙ্গা! জওহরলাল নেহরুর ১৪ই আগস্ট মধ্যরাতের ভাষণে পাওয়া ‘ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি’ গেরোয় জীবন্ত থাকে ধর্মীয় মৌলবাদ। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ বাঁচেন জাত-ধর্মে ভেদাভেদ করবেন বলেই। সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের দেশে গানেও চলে ধর্মীয় দাঙ্গার উসকানি।
মনুবাদ-মৌলবাদের আস্ফালন বেড়েই চলে হিন্দুস্তান-পাকিস্তান-বাংলাদেশের তামাম মানচিত্র জুড়ে। যাঁরা বলেছিলেন দেশভাগ হলেই শান্ত হবে মুলুক, তাঁরা কালের নিয়মে পৃথিবী ছেড়ে গেলেও রয়ে যান কলেজ, বন্দরের নামে, আদালতের দেয়াল জুড়ে। যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমবারের জন্য দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা বলেছিলেন, তাঁরও হিন্দুস্তানের মাটি ছেড়ে পাকিস্তানের করাচিতে যেতে মনের কোথাও যেন কষ্ট জমা হয়। আজ এতগুলো বছর পরেও মাংস খাওয়ার অপরাধে এক গরিব পরোটাওয়ালাকে ট্রেনের বগিতে ফেলে পেটায় তাঁরই সহনাগরিকরা।

যে রেলের লাইন দিয়ে ছুটে চলা হিন্দুস্তানগামী ট্রেনে দাঁড়িয়ে এক যুবক চিৎকার করে বলছিলেন, ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’, তিনি ২০২৬-এর দিলজিৎ দোসাঞ্ঝ-এর মুঠোফোন ভেদ করে শেষবারের মতো তাঁর জিয়ার ছবিতে তাকিয়ে বোধ করি আষাঢ় রাতে মনে মনে বলতে থাকেন— ‘উদাসীন থেকো না সাড়া দাও’।