সীমান্ত লাগোয়া দেশ মায়ানমারে আফিম চাষের বৃদ্ধির কারণে বড় হুমকির মুখে ভারত। এর আঁচ যে শুধু সীমান্তের নিরাপত্তাজনিত বিষয়ের ওপর থেমে, এমনটা নয়। বরং উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেও ঘুণ ধরাচ্ছে পড়শি দেশের এই নেশাজাতীয় দ্রব্যের উৎপাদন। তথ্য অনুযায়ী, ৭০-এর দশক থেকে মাদক পাচারের মতো সমস্যার সঙ্গে জুঝছে উত্তর–পূর্ব ভারত। এর নেপথ্যের মূল কারণ হল, ভারত-মায়ানমার সীমান্তে ঢিলেঢালা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অঞ্চলটির নৈকট্য। মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এই সংকটের মূল ভুক্তভোগী।
বিশ্বজুড়ে মাদক পাচার অপ্রচলিত নিরাপত্তা (Non-Traditional Security) হুমকি হিসেবে বিবেচিত। এই মাদক পাচার থেকে অবৈধ অর্থনীতির প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান হয় বলে জানা যায়। যার পরিমাণ প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বর্তমানে আফিম উৎপাদনে আফগানিস্তানের পরে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মায়ানমার। আশঙ্কা করা হচ্ছে, কদিন পর এই দেশটি আফিম চাষে আফগানিস্তানকে টেক্কা দিতে শুরু করবে। মায়ানমারের শান ও কাচিন রাজ্যে আফিম অধিক আফিম উৎপাদন হলেও, ইদানিং সাগাইং (Sagaing) ও চিন (Chin) অঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটেছে বলে খবর।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তর (UNODC)-এর রিপোর্ট বলছে, ২০২৩ সাল অবধি মায়ানমারে হু হু করে বেড়েছে অবৈধ আফিম চাষের জমি। ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এই জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,১৬,০০০ একরে। পাশাপাশি ১৬ শতাংশ হারে আফিম উৎপাদন বেড়েছে। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি চাঙ্গার চেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাসের কারণে সে দেশে আফিম চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালে সম্ভাব্য শুকনো আফিমের উৎপাদনের পরিমাণ ১,০৮০ মেট্রিক টন, যা ২০০১ সালের পর সর্বোচ্চ।
মাদক পাচার জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত। প্রথমত, সীমান্তে মাদক পাচারের জন্য ব্যবহৃত পথের মাধ্যমে সহজেই অস্ত্রশস্ত্র পাচার, জঙ্গি কার্যক্রম ও অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই অবৈধ মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ জঙ্গি সংগঠনগুলোর অর্থায়নের উৎস হিসেবে কাজ করে। উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু আঞ্চলিক রাজনীতি সরাসরি মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ ওঠে।
মণিপুরের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী লাবা ইয়ামবেম কেন্দ্রীয় সরকার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে বলেন, যেহেতু মায়ানমারের বর্তমান সরকারের পক্ষে চীন, তাই যে কোনো উপায়ে মায়ানমারকে চাপে রাখতে চায় ভারত ও আমেরিকা। তিনি আরও জানান, শুধুমাত্র মণিপুরেই প্রতিবছর প্রায় ১৭০০ কোটি টাকার বেশি মাদক বাণিজ্য হয়ে থাকে।
সেখানকার মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক সচেতন মানুষেরা এও প্রশ্ন তোলেন যে, যদি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যেই যদি ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর কাজ শুরু এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা যায়, তবে মণিপুরের ক্ষেত্রে কেন উল্টো নিয়ম? এমনকী পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের কঠোর অবস্থানকে মনে করিয়ে তারা বলেন, তাহলে মণিপুরের ভূমিতে তিন বছর ধরে চলে আসা জাতিগত দাঙ্গার ক্ষেত্রে কেন নীরব ভূমিকা পালন করছে সরকার? এ ধরনের অবস্থানকে স্থানীয় অনেকেই কুকি জনজাতির মিলিশিয়াদের প্রচ্ছন্ন মদত দেওয়া হিসেবে দেখছেন।
মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও মণিপুরে হেরোইন ও সিন্থেটিক মাদক সহজলভ্য হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় জনগণের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা বেড়েছে। ফলত, এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ জীবাণুমুক্ত না করা ইনজেকশনের মাধ্যমে অবাধে ড্রাগ নিচ্ছে যুবসমাজ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতকে এই সমস্যা মোকাবিলা করতে সীমান্তে নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনি আরও জোরদার করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকেও নজর দিতে হবে। সেইসঙ্গে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের মানে উন্নতি ও তাঁদের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।