Shopping cart

সম্পাদক সমীপেষু

ক্ষমতার অলিন্দেই কি ন্যায়ের চাবিকাঠি?

17

আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ঘটে যাওয়া তরুণী চিকিৎসকের মর্মান্তিক ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনাটি কেবল একটি পাশবিক অপরাধ নয়; সমগ্র সমাজের বিবেকে এক গভীর ও স্থায়ী ক্ষত। সম্প্রতি সেই ঘটনার সুবিচার চেয়ে নির্যাতিতার মা-বাবার একপ্রকার বাধ্য হয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণের খবরটি স্বাভাবিকভাবেই সংবাদমাধ্যম ছেয়ে ফেলেছে। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে তাঁদের বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই; বরং মেয়ের হত্যার সুবিচার নিশ্চিত করার তাগিদেই তাঁদের এই মরিয়া পদক্ষেপ। এক চরম শোকসন্তপ্ত পরিবারের এই উপলব্ধি ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থার দিকে এক অমোঘ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়— তবে কি ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ক্রমশ কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালীদের একচেটিয়া আধিপত্যে পর্যবসিত? সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের জন্য ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করাটা কি আজ এক অলিখিত শর্ত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধ্রুপদী তত্ত্ব, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং রূঢ় বাস্তবতার এক দার্শনিক ও তুলনামূলক পর্যালোচনায় প্রবেশ করতে হবে।

এই চরম শোকসন্তপ্ত পরিবারের উপলব্ধি ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের দিকে যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেয়, তার তাত্ত্বিক উত্তর নিহিত রয়েছে ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কুর বিখ্যাত ‘সেপারেশন অফ পাওয়ারস’ বা ‘ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ’ তত্ত্বের মধ্যে। ১৭৪৮ সালে প্রকাশিত তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য স্পিরিট অফ লজ়’-এ (The Spirit of Laws) মন্টেস্কুর স্পষ্ট সতর্কবার্তা ছিল, যদি রাষ্ট্রের শাসনবিভাগ এবং বিচারবিভাগের ক্ষমতা একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তবে সমাজে নাগরিকের কোনো স্বাধীনতা থাকতে পারে না। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাই রাষ্ট্র পরিচালনার তিনটি মূল স্তম্ভ— আইনসভা, শাসনবিভাগ এবং বিচারবিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং একে অপরের ওপর নজরদারি চালাবে।

ভারতীয় সংবিধানের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণের বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অত্যন্ত কঠোর না হলেও, এর একটি সুনির্দিষ্ট ও সূক্ষ্ম ভারসাম্য বা ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস’ রয়েছে। আমাদের সংবিধান প্রণেতারা অত্যন্ত সচেতনভাবেই বিচারবিভাগকে শাসনবিভাগের ছায়া থেকে মুক্ত রাখতে চেয়েছিলেন। তাই সংবিধানের ৫০ নম্বর ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিতে (ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপালস অফ স্টেট পলিসি) শাসনবিভাগ থেকে বিচারবিভাগকে পৃথক রাখার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এছাড়া, ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক ‘কেশবানন্দ ভারতী বনাম কেরালা রাজ্য’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এই ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণকে সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো’ বা ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছে। যার অর্থ, সংসদ বা শাসনবিভাগ চাইলেও গরিষ্ঠতার জোরে কোনোভাবেই বিচারবিভাগের এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

তত্ত্বগতভাবে এই স্বাধীনতা সুনিশ্চিত হলেও, ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ লর্ড চিফ জাস্টিস গর্ডন হিউয়ার্ট তাঁর যুগান্তকারী রায়ে বলেছিলেন, “Justice must not only be done, but must also be seen to be done”— অর্থাৎ, বিচার কেবল করলেই হবে না, বিচার যে হচ্ছে এবং তা যে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, তা দৃশ্যতও সাধারণের কাছে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কিন্তু যখন কোনো বিচারপ্রার্থী মনে করেন যে, খোদ শাসন বা আইনসভার অংশ না হলে তিনি কাঙ্ক্ষিত বিচার পাবেন না, তখন এই ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণের তত্ত্বটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে।

এই জনমানসিকতার পিছনে থাকা পরিসংখ্যান ও গবেষণার তথ্যগুলোও রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোনের সেই বিখ্যাত উক্তি— “Justice delayed is justice denied” আজ ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক নির্মম সত্য। ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ডেটা গ্রিড-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বিভিন্ন স্তরের আদালতে বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটিরও বেশি মামলা বিচারাধীন অবস্থায় ঝুলে রয়েছে, যার মধ্যে খোদ সুপ্রিম কোর্টেই আটকে আশি হাজারের বেশি মামলা! অথচ, এই পাহাড়প্রমাণ মামলার জট ছাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো বা সদিচ্ছা কোনওটাই দৃশ্যমান নয়। ভারতের জিডিপি-র মাত্র ০.১ শতাংশের সামান্য কিছু বেশি বরাদ্দ হয় বিচারব্যবস্থার জন্য, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিতান্তই নগণ্য। ১৯৮৭ সালে ভারতের আইন কমিশন তাদের ১২০তম রিপোর্টে সুপারিশ করেছিল, প্রতি দশ লক্ষ নাগরিক পিছু অন্তত পঞ্চাশ জন বিচারক থাকা প্রয়োজন। চার দশক পেরিয়ে গেলেও সেই সংখ্যাটি আজও একুশের আশেপাশে থমকে আছে। অন্যদিকে, ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রিপোর্ট বলছে, দেশের সংশোধনাগারগুলোতে থাকা বন্দিদের প্রায় ৭৬ শতাংশই বিচারাধীন বা ‘আন্ডারট্রায়াল’। এঁদের বেশিরভাগই এমন আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ, যাঁদের জামিন নেওয়ার মতো ন্যূনতম আর্থিক সংগতিটুকুও নেই। বিত্তশালী ও ক্ষমতাবানরা নামজাদা আইনজীবীর সাহায্যে এই কাঠামোগত দীর্ঘসূত্রতাকে অনায়াসে নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগান। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে সর্বস্বান্ত হন। আরজি করের নির্যাতিতার পরিবারের রাজনীতিতে আসার ইচ্ছা আসলে সেই কাঠামোগত অসহায়ত্বেরই চরম বহিঃপ্রকাশ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়তে গেলে সাধারণ মানুষও ক্ষমতার বর্ম খুঁজতে বাধ্য হন।

এই হতাশাজনক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এনসিইআরটি এবং বিচারবিভাগের মধ্যকার সাম্প্রতিক বিতর্কটিও এক অমোঘ আয়নার মতো কাজ করে। সম্প্রতি এনসিইআরটি-র অষ্টম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা সংক্রান্ত একটি অধ্যায়ে বিচারবিভাগের একাংশে দুর্নীতি, পরিকাঠামোগত অভাব এবং মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এর কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় এবং মন্তব্য করে যে, এটি কোমলমতি পড়ুয়াদের মনে বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরির চক্রান্ত। ফলস্বরূপ, বইটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়। একদিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত তার প্রাতিষ্ঠানিক পবিত্রতা রক্ষার্থে বদ্ধপরিকর; কিন্তু অন্যদিকে, আরজি করের নির্যাতিতার পরিবারের রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত আমাদের সেই রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা এনসিইআরটি-র ওই বাতিল হওয়া অধ্যায়টিরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সমাজ ও রাষ্ট্রের রূঢ় সত্যকে পাঠ্যবই থেকে মুছে ফেললেই কি বাস্তবের মাটি থেকে তা উধাও হয়ে যায়? এই প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবিধানের রূপকার ড. বি. আর. আম্বেদকরের সেই কালজয়ী সতর্কবাণী স্মরণ করা অবশ্যম্ভাবী। সংবিধান সভার শেষ ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “আমরা এক চরম স্ববিরোধিতার যুগে প্রবেশ করতে চলেছি। রাজনীতিতে আমাদের সমতা থাকবে, কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে থাকবে চূড়ান্ত বৈষম্য।” আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই বৈষম্য আর কেবল সমাজ বা অর্থনীতিতেই আটকে নেই, তা প্রবল ভাবে বিচারব্যবস্থাকেও গ্রাস করেছে।

ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ কেবল সংবিধানের পাতায় বন্দি কোনও আলংকারিক শব্দবন্ধ হয়ে থাকতে পারে না। ঔপনিবেশিক আমলের প্রভুত্বকামী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে বিচারব্যবস্থাকে আধুনিক, দ্রুত ও সংবেদনশীল করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিচারব্যবস্থার প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই সার্থক, যখন একজন ক্ষমতাহীন, প্রান্তিক নাগরিকও দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করবেন যে ন্যায়ের জন্য তাঁকে ক্ষমতার অলিন্দে মাথা ঠুকতে হবে না। তার জন্য প্রয়োজন অবিলম্বে বিচারব্যবস্থায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, কাঠামোগত আধুনিকীকরণ এবং বিচারকের বিপুল শূন্যপদ পূরণ করা। বিচার যদি কেবল প্রভাবশালীদেরই বিশেষ অধিকার হয়ে দাঁড়ায়, তবে গণতন্ত্র তার অন্তিম অর্থটুকুও হারায়। আরজি করের নির্যাতিতার পরিবারের এই রাজনৈতিক অভিলাষ ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি নিঃসন্দেহে এক প্রবল অশনি সংকেত। বিচারব্যবস্থাকে বাস্তবে সাধারণের নাগালে আনতে না পারলে, মানুষের মনে এই ধারণাই চিরস্থায়ী হবে যে, ন্যায়ের দেবীর চোখের বাঁধন কেবল ক্ষমতাবানদের পাপকে আড়াল করার জন্যই। ভারতীয় গণতন্ত্রের সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, সাধারণ মানুষের এই অসহায়ত্ব দূর করে ন্যায়ের প্রতি অবিচল আস্থা ফিরিয়ে আনা।

সম্পর্কিত খবর