Shopping cart

সম্পাদক সমীপেষু

দিশেহারা আগামী! দৃষ্টি চাই

215

এক অদ্ভুত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আসলে দোষটা কি সত্যিই আমাদের? নাকি আমরা ভুল সময়ে পৃথিবীতে হাজির হয়েছি? আমার মতো লক্ষ লক্ষ বেকারের প্রশ্ন এটা! আমি ৯০-এর দশকের শেষে জন্মগ্রহণ করেছি। জ্ঞান হওয়া থেকে দেখে আসছি বছর বছর পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, চেনা-পরিচিতদের সরকারি চাকরি হচ্ছে। ভাবতাম বোধহয় এটাই স্বাভাবিক, এটাই নিয়ম। ভেবেছিলাম বড় হলে আমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই হবে। কিন্তু এখন আমাদের এমন দশা কেন? কে করল? আমরা নিজেরাই? নাকি সময়?

১১ সালের আশেপাশে এক উত্তাল সময় আমরা পেরিয়ে এসেছি। তখন আমি বছর বারো। আশেপাশের রাজনৈতিক বাতাবরণ তখনও তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি মনে। শুধু দেখতাম বাড়ির নীচ দিয়ে লাল ঝাণ্ডার মিছিল যাচ্ছে। কিছু পরিচিত গলার আওয়াজ পেতাম মিছিল থেকে। ভাবতাম এই পার্টিই আমার পার্টি, আমার নিজের পার্টি। তখন সেই কাঁচা মস্তিষ্কে এর চেয়ে আর বেশি কিছু ঢুকত না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝলাম আমাদের সময় ফুরিয়েছে। এখন আমাদের কথা কেউ ভাবে না! আমরা অভিভাবক হারিয়েছি। দিশেহারা হয়ে নাম লেখালাম বেসরকারি খাতায়। শরীরের দফারফা হল বছর তিনেকের মধ্যেই। প্রাণে বাঁচতে চাকরি ছাড়লাম।

নিয়মিত খোঁজখবর রাখতাম ভারতীয় রেলের কোনো রিক্রুটমেন্ট নোটিফিকেশন ছাড়ছে কি না। খবর নিয়ে জানতে পারলাম ২০১৯-এর পর থেকে রিক্রুটমেন্ট বন্ধ। হাজার হাজার শূন্যপদ! ভেবেছিলাম প্রস্তুতি নেব, কিন্তু হল না! আবার এদের অর্থাৎ কেন্দ্র সরকার যারা চালাচ্ছে, তাদের এই ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান আমার মাথা গরম করে দেয়। ভাবি, কিসের রাম? কিসের জয়? আমার চাকরি কোথায়? বিগত কয়েক বছরে একের পর এক রেল দুর্ঘটনার সাক্ষী থেকেছি আমরা। আমরা দেশের সাধারণ মানুষ। আমাদের মৌলিক অধিকার হল খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা এবং সরকারের কাজ সেটা সুনিশ্চিত করা। তারপরে রাম আসবে।

৫০০ বছরের পুরনো তথাকথিত রামকে তাঁর ঘর বানিয়ে দিয়ে চারবেলা সেবার আয়োজন করে দেওয়া হল, অথচ বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরি হল না। ওরা চাকরি দিল না, ওরা দু-বেলা দু-মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করে দিতে পারল না, অথচ সেই খাবার রান্না করা গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিল। বিভিন্ন জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিল।

আমার রাজ্যে প্রায় ৮ হাজার প্রাথমিক স্কুল বন্ধ। শিক্ষক নেই, ছাত্র নেই। যেটুকু বেঁচে আছে তাদেরও জীর্ণ দশা। বন্ধের মুখে! ‘How.’ নিউজ চ্যানেলের মাধ্যমে দেখছিলাম কোনও এক প্রত্যন্ত গ্রামে কোনও স্কুল নেই। লাল পার্টি উদ্যোগ নিয়ে গাছের নিচে ছাত্রছাত্রী নিয়ে স্কুল চালাচ্ছে। আমরা সাক্ষী থেকেছি ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের ঘটনার। স্তম্ভিত হয়েছি! ভেবেছি! এ কোন সময়ে আমরা এসে পৌঁছেছি? কেন আমরা এখন স্বপ্ন দেখতে পারি না? কেন আমাদের স্বপ্ন দেখার মৌলিক উপাদানগুলো অবশিষ্ট রাখা হয়নি? কী দোষ আমাদের? কেন আমরা বঞ্চিত থাকব সমস্ত রকম সামাজিক অধিকার থেকে? লাল পার্টির আমলে চাকরি পাই বা না পাই, অন্তত একটা সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন তো দেখতে পারতাম! রাজ্যের এই সরকার অন্ধ করে দিয়েছে আমাদের। এর থেকে নিস্তার চাই।

১১ সালের আগে যারা সরকারি চাকরি পেয়েছে, চোখের সামনে দিয়ে সকালে খাওয়া-দাওয়া সেরে স্কুল/কলেজ/অফিস যায়। বিকেলের মধ্যে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে পরে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার নিয়ে সময় কাটায়। তারা প্রিভিলেজড? শুধুমাত্র সঠিক সময়ে জন্মেছে বলে? আর আমরা?

দ্য গ্রেটেস্ট শোম্যান রাজ কাপুর বলেছিলেন, “The show must go on”… কিন্তু কীভাবে?

সময় প্রবাহমান, তাই রাজ কাপুরের বলে যাওয়া কথা কালের নিয়মে রাস্তা খুঁজে এগিয়ে যাবে নিজের মতো করে। আজকের লজ্জিতরা কালকে গর্বিত হবে। আজকের গর্বিতরা কালকে লজ্জিত হবে। কিন্তু এই যে আপামর একটা যুবসমাজকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে নিকষ কালো অন্ধকারে, ভবিষ্যৎ কিন্তু তার মতো করে বদলা নেবে।

সম্পর্কিত খবর