এই এক অদ্ভুত সময়। সত্যি বাংলার মানুষ অনেক কিছু দেখেছে। দাঙ্গা, দেশ ভাগ, কংগ্রেস শাসন, খাদ্য আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন, সিপিএমের লাল জামানা, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, কালীঘাটের টালির চালের মমতা ব্যানার্জির মুখ্যমন্ত্রী হওয়া, অনেক কিছু। কিন্তু হঠাৎ করেই জলজ্যান্ত মানুষটা, যে বাংলায় ভোট দিয়ে আসছে বিগত ২০-২৫ বা তারও বেশি বছর ধরে, তার ভোটাধিকার চলে যাওয়া, বেনাগরিক হওয়ার আশঙ্কা, ডিটেনশন ক্যাম্পে যাওয়ার ভয় এবং অমিত শাহ্র কথা অনুযায়ী “ডিপোর্ট” করা অর্থাৎ অন্য দেশে পাঠানোর দুঃস্বপ্ন, সেই আতঙ্কে মৃত্যু মিছিল— এ ঘটনা বাংলা কোনদিন অতীতে দেখেনি।
আমরা গল্প উপন্যাসে, হলিউড বা লাতিন আমেরিকার সিনেমায় দেখতাম। কিন্তু কোনদিন যে আমাদেরও এই অবস্থায় পড়তে হবে, আমরা কল্পনাতেও ভাবিনি। ঠিক যেমন কলকাতার বুকে বা শিলিগুড়ি, হলদিয়া, দুর্গাপুরে বোমা পড়ছে বোমারু বিমান থেকে, যেমন আজ ইরান লেবাননে পড়ছে বা নয় দিন আগেও গাজাতে পড়েছে, আমরা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি না। ঠিক সেই রকম আজ বাংলায় যা হচ্ছে আমার ভাবনার সীমার বাইরে ছিল।
তুমি আছো। কিন্তু সরকারের কাছে তোমার কোনও অস্তিত্ব নেই! এবং এই ভয়ঙ্কর প্রক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্ট সিলমোহর দিয়ে একপ্রকার বৈধতা দিয়ে দিল। বুকে হাত দিয়ে বলুন এমনটা যে হবে বা হতে পারে, এক বছর আগেও কিন্তু বাংলার মানুষ দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারত কি? পারত না। কিন্তু আজ চোখের সামনে দেখল। শুধু তাই নয়, যাঁদের নাম সরকারি ভোটার তালিকায় নেই, পড়শি তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখছে! বহিরাগত। ঘুসপেটিয়া। বেটা বাংলাদেশি, এতদিন ঘাপটি মেরে বসেছিল। এবার মর! কি জান্তব উল্লাস! ঠিক এটাই ঘটেছিল ১৯৩২-৩৫-৪০ সালের জার্মানিতে।
আমরা শুনেছি। ইতিহাস বইতে পড়েছি। এবার চোখের সামনে পাঁচ মাস ধরে দেখলাম! প্রথমে সমর্থন করলাম অমিত শাহ্র গোপন নকশার এই ঝাড়াই বাছাই প্রক্রিয়া। তারপরে চিৎকার করলাম, আদালতে গেলাম, তারপরে… তারপরে… জ্ঞানেশ কুমার আর সূর্যকান্ত মিলে সদলবলে যা বললেন, সেটা মেনে নিলাম। মানতে বাধ্য হলাম। কোমরের বেল্ট টাইট করে বা আঁচলের শাড়িটা কোমরে জড়িয়ে নিয়ে বললাম, চললাম ভোট করতে। আপনি আপাতত ট্রাইব্যুনালের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকুন!
কারণ, ভোট গণতন্ত্রের উৎসব।
তাহলে পাঁচ মাস ধরে কী হল? চলতি কথায় পাড়ার লোচ্চা বলবে, পিছন মারার খুড়োর কলের খেলা। আমরা ভদ্রলোক। খারাপ কথা বলতে পারি না। আমরা বলব, একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে শুদ্ধিকরণ হল। কার শুদ্ধিকরণ? আমার, আপনার, নাগরিকের। সেটি প্রসব করেছে নির্বাচন কমিশন।
দেখুন এসআইআর-এর ফলে কত ভোটার বাদ গেল তা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে বলা হচ্ছে যে এ রাজ্যে প্রায় ৯২ লক্ষ মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলেন। তার মধ্যে সিংহভাগ নাকি হিন্দু, তুলনায় মুসলমান কম। আমার কিন্তু স্পষ্ট কথা। এই হিসেবে গরমিল আছে। আসলে বাদ গেছেন প্রায় চল্লিশ লক্ষের মতো মানুষ, যারা ২০২৪ সালে ভোট দিয়েছিলেন এবং যারা এই রাজ্যের বৈধ নাগরিক। এবারও ভোট দেওয়ার যোগ্যতা তাদের রয়েছে।এর কারণটা কী? খসড়া তালিকায় যে ৫৮ লক্ষ মানুষ বাদ গিয়েছিলেন, তার মধ্যে যদি প্রায় ১০% ধরা যায় যাদের কাগজপত্র ঠিকঠাক ছিল, তাহলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৫ লক্ষ। এরপরে ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’র নাম করে যে ১ কোটি ৪৬ লক্ষ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে নথি চাওয়া হল, তার মধ্যে প্রথম ৮৩ লক্ষের মধ্যে বাদ গিয়েছেন প্রায় ৭ লক্ষ। বাকিরা তাঁদের ভাগ্য ছেড়ে দিয়েছিলেন বিচারকদের হাতে, আর সেই ক্ষেত্রে বাদ পড়েছেন ২৭ লক্ষ ভোটার। সব মিলিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়াচ্ছে ৪০ লক্ষের মতো।
এই প্রথম পর্যায়ে যারা বাদ পড়েছিলেন তারা হিন্দু ছিলেন বটেই, কিন্তু ড্রাফট লিস্টে যাদের নাম দেওয়া হয়েছে তারা অধিকাংশই মৃত, স্থানান্তরিত বা ডুপ্লিকেট ভোটার। ফলে তাঁদের নাম বাদ যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু পরবর্তীকালে যে ১ কোটি ৪৬ লক্ষ মানুষকে যুক্তিগত অসঙ্গতির ( Logical Discrepancies) জন্যে ডাকা হল তাদের মধ্যে প্রথম দফায় সাড়ে সাত লক্ষ এবং পরে বিচারাধীন হিসেবে আরও সাড়ে সাতাশ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হল। প্রথম ড্রাফট লিস্টে বাদ পড়েছিলেন প্রায় পাঁচ লক্ষ। অর্থাৎ এবারের ভোট এই ৪০ লক্ষ বৈধ সহ-নাগরিকদের বাদ দিয়েই হচ্ছে এবং কার্যত আমরা সেটা মেনেও নিয়েছি। যদিও সাধারণ মানুষ মানতে পারছেন না, তাই রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ হচ্ছে। কোচবিহার, মালদা, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, হুগলি—রাজ্যের প্রায় সর্বত্র কম-বেশি আমরা মানুষকে বিক্ষোভ দেখাতে দেখেছি। এদের মধ্যে কতজনের নাম ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা করবে? ট্রাইব্যুনালে শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক মানুষ, গরিব মানুষ, দলিত, মুসলমান—একেবারে খেটে খাওয়া মজদুররা যেতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন সকলের মনেই আছে। কিন্তু ওই যে বলে না আদালত আছে সবার উপরে, তাহার উপরে নাই, সেই কারণে আমাদের মেনে নিতে হয়েছে। এই মুহূর্তে ভোটের প্রচার চলেছে পূর্ণোদ্যমে। ফলে এই নাগরিকদের নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতারা মুখে নানা রকম কথা বললেও, তাঁদের পক্ষে ভোটাধিকার ফিরে পেয়ে এবার ভোট দেওয়া অসম্ভব। ভোটের পরে কী হবে? তারা নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার ফিরে পাবেন কি না, তা নিয়েও আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষ তো প্রকাশ্যেই বলছেন, এরা সব অনুপ্রবেশকারী, দেশদ্রোহী। বিরোধী দলনেতা এবং শাহ্র মতে, ‘মুখ্যমন্ত্রী মুখ’ শুভেন্দু অধিকারীরও প্রায় একই মত। অর্থাৎ বিজেপি এটাই মনে করে। এঁদের নেতৃত্ব, যিনি মাথায় বসে রয়েছেন, সেই অমিত শাহ, কলকাতায় ক্যাম্প করে বসে স্পষ্ট বলে দিচ্ছেন, এই চল্লিশ লক্ষ মানুষ আসলে বাংলার নাগরিকই নয়। এরা অনুপ্রবেশকারী। ভোট অবধি এই তরজা চলবে। আসুন বরং আমরা দেখি, এর ফলে ভোটার তালিকায় ডেমোগ্রাফিক যে পরিবর্তন হলো, তাতে কোন দলের প্রাথমিকভাবে সুবিধা হল।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় যে ৩৫ লক্ষ মানুষ বাদ পড়লেন তারা মূলত উত্তর দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়ার একাংশ, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কোচবিহার এবং বীরভূমের ভোটার বেশি। যদি তুলনামূলক বিচার করা যায় তাহলে কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, বসিরহাট এবং বীরভূম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় মুসলিম ভোটার বাদ গিয়েছেন সর্বাধিক। স্বাভাবিকভাবেই এই সব জেলার বহু আসনে ডেমোগ্রাফির পরিবর্তন হয়েছে। আমরা জানি ভারতের বর্তমান অবস্থায় মুসলমানদের ভোট স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি বিরোধী শক্তির কাছে যায়। এবার যদি মুসলিম ভোটারের সংখ্যা বেশি বাদ যায় তাহলে বিজেপির যে সুবিধা হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন হচ্ছে কটি আসনের সুবিধা হবে, কোন আসনের সুবিধা হবে এবং কত শতাংশের ভোট কমলে বিজেপি সুবিধে পাবে? প্রাথমিকভাবে যেসব আসনে তৃণমূল গত বিধানসভা এবং লোকসভায় ৫০০০ থেকে ১৫ হাজার ভোটে জিতেছিল বা এগিয়েছিল, সেই সব আসনে নিঃসন্দেহে বিজেপি সুবিধা পাবে।
কীভাবে মুসলিম প্রধান আসনে যুক্তিগত অসঙ্গতি দেখিয়ে নাম কাটা হয়েছে, তার কিছু পরিসংখ্যান দিচ্ছি। মুর্শিদাবাদ জেলার সামশেরগঞ্জ ৭৪ হাজার, লালগোলা ৫৫ হাজার, বেলডাঙা ৪৭ হাজার, রঘুনাথগঞ্জ ৪৬ হাজার, মালদহের মানিকচক, বৈষ্ণবনগর, সুজাপুর, মোথাবাড়ি থেকে আরম্ভ করে গাজল পর্যন্ত একই চিত্র। স্বাভাবিকভাবেই সুবিধা পাবে বিজেপি। তবে, তার মধ্যে কটি আসন জিতবে সেটা বলা মুশকিল, কিন্তু বেশ কয়েকটি জিতবে। এবং তৃণমূলের আসন গতবারের (৮) তুলনায় কমবে। অন্যদিকে উত্তর ২৪ পরগনা ও নদীয়ার মতুয়া অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে ভোটার বাদ গেলেও সংখ্যা এত বেশি নয়। একই কথা বলা চলে কলকাতার ভবানীপুর থেকে নন্দীগ্রাম সর্বত্র। মুসলিম ভোট কাটার শতাংশ হিন্দু ভোট কাটার শতাংশের থেকে অনেক বেশি।সামগ্রিক ভাবে যে পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট, এইআইআর-এর ফলে রাজ্যে নিশ্চিতভাবেই বিজেপি সুবিধা পাবে। অন্তত ১৫টি আসন এইআইআর হওয়ার কারণেই তারা জিতে যেতে পারে।
বাকি রইল ভোটারদের অধিকার এবং নাগরিকত্বের প্রশ্ন। আপাতত সেইগুলি তোলা থাক। দেখা যাবে ভোটের পর।
















