গোরু-রাজনীতির গুঁতো গোরু-অর্থনীতিকে

২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

এঁড়ে জন্মে নিলে মানুষের স্ফূর্তি কম হয়। আনন্দ হয় বকনা জন্মালে।

বিখ্যাত নাটকের প্রায় প্রবাদে পরিণত হওয়া উক্তি আছে, ‘খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে। কাল হলো তার এঁড়ে গোরু কিনে।’ রাজ্যের গোপালকরা এখন এঁড়ে গোরু কেনার থেকেও বড় সঙ্কটের মুখোমুখি।

এঁড়ে মানে পুরুষ গোরু। বকনা কিংবা বকন মানে নারী গোরু। ‘গোরুচাষীরা’ মানুষ। গো-পালনের উপর তাঁর সন্তানের পড়াশোনা, ‘মেয়ের বিয়ে’, মাস-বছরের খাওয়া দাওয়া, মোবাইলের রিচার্জ— সব নির্ভরশীল। নিজেদের সমাজে তাঁরা যা-ই করুন, গোরুর ক্ষেত্রে মানুষ নারী গোরুর জন্মেই বেশি খুশি হন।

গোরুচাষীদের সেই জীবনযাপনের মেরুদণ্ডে ধাক্কা লেগেছে। রাজ্যে বিজেপি’র সরকার হয়েছে। ১৪ বছরের কম বয়সের গোরু বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়েছে। গোরু জবাই করতে হলে পশু চিকিৎসকের শংসাপত্র লাগবে। শুধু তাঁর স্বাক্ষরেই কাজ হবে না। লাগবে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির সইও। তারপর জবাই করা যাবে। জবাই করা যাবে প্রশাসনের নির্দিষ্ট করা জায়গায়। ১৯৫০ সালের যে আইনটির ভিত্তিতে সরকারের এই নির্দেশ, আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্যর মতে সেই আইন তৈরি হয়েছিল কলকাতা এবং কালিম্পং পৌরসভার জন্য। গ্রামাঞ্চলের জন্য তা প্রযোজ্য নয়।

কিন্তু এখন তা সমগ্র রাজ্যের জন্য। ফলে বকনাদের আগে গোরু বিক্রি কার্যত বন্ধ। রাজ্যের বিজেপি সরকার অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। বিপন্ন গোপালকদের সুবিধার্থে সরকার কী অলাভজনক গোরুদের জন্যও এমন হোল্ডিং সেন্টার বানাবে? এই প্রশ্নের জবাবে বিজেপি’র মুর্শিদাবাদের বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলেছেন, ‘‘সরকার নিশ্চয়ই এই আইনের পরবর্তী পদক্ষেপ ভেবেছে। আশা করি যাঁরা সমস্যায় পড়েছেন, তাঁরা সেই সমস্যা থেকে সুরাহা পাবেন।’’

কিন্তু বিধায়কের আশা গোপালকদের কাছে পৌঁছয়নি। তাঁরা কোনও আশা দেখছেন না। সর্বশেষ পশু সমীক্ষার রিপোর্ট অনুসারে দেশের সবচেয়ে বেশি গবাদি পশুর ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গ। ২০২৫-এর জানুয়ারিতে সংসদে পেশ হওয়া রিপোর্ট অনুসারে রাজ্যে ১ কোটি ৯০ লক্ষের বেশি গবাদি পশু আছে। গবাদি পশু মানে গোরু এবং মোষ। পশ্চিমবঙ্গের ঘাস, খড়, খোল খেয়ে বেঁচেবর্তে থাকা এই ১ কোটি ৯০ লক্ষের বেশি গবাদি পশুর মধ্যে গোরুরা সংখ্যাগরিষ্ট।

এই গোরুদের যাঁরা লালন-পালন করেন তাঁরা ‘গোরু চাষী।’ এই নামই গ্রাম বাংলায় চলে। আমরা একে শুদ্ধভাবে বলতে পারি গোপালক। রাজ্যের গোপালকদের এক বড় অংশ থাকেন মুর্শিদাবাদে। সেই জেলার দুগ্ধচাষী সমিতির সম্পাদক ভরত ঘোষের কথায়, ‘‘গোপালকদের মধ্যে হিন্দু আছেন, মুসলমানও আছেন। হিন্দুরাই বেশি। তবে হিন্দু হোন কিংবা মুসলমান, গোপালকরা প্রধানত গরিব গ্রামবাসী।’’

এই গরিবরা পড়েছেন মহা মুশকিলে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে তাঁদের জীবন-মরণ সমস্যা। এই সমস্যা শুধু বকনাদের উপর নির্ভরশীল নয়। কারণ, গোরু বিক্রি, কেনা সারা বছর চলে। খড়গ্রামের আইসা গ্রামের গোরুচাষী নীলকণ্ঠ ঘোষের কথায়, ‘‘দিনে ১০ লিটার দুধ দেওয়া একটি সাধারণ গোরুর জন্য দৈনিক প্রায় ৩০০ টাকা খরচ। সেই গোরু ৫০ টাকার খড় কিংবা ঘাস খায়। ১৯০ থেকে ২০০ টাকার নেপালী খোল লাগে। এছাড়া ভাত, আটাও লাগে। ওষুধ সহ অন্যান্য খরচ আছে আরও প্রায় ৫০ টাকা।’’

সারাদিনে একটি ‘সাধারণ’ গোরুর দুধ বিক্রি করে দুগ্ধচাষীর লাভ ১০০ টাকা থেকে ১২৫ টাকা। কারণ— দুধের দাম এখন ৪০ টাকা লিটার। দুধের সমবায়ে সরাসরি দুধ বিক্রি করতে পারেন না চাষী। এখানেও ফড়ে আছে। তারই ঠিক করা দাম— লিটার প্রতি ৪০ টাকা। ‘সাধারণ’ গোরু মানে পশ্চিমবঙ্গে সাইয়াল কিংবা জার্সি। এর বাইরে আরও ভালো জাতের গোরু আছে। সেই গোরু দিনে ২০ লিটার পর্যন্ত দুধ দিতে পারে। তবে সেই অনুপাতে তার পিছনে খরচও কিছুটা বেশি। ফলে গরিব দুগ্ধচাষীর ভরসা সেই সাধারণ গোরু।

কিন্তু সরকারের নির্দেশিকার পর গোরুর অর্থনীতি নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? সরকার গোরু বিক্রি, গোরু জবাই আটকেছে। দুধ তো আটকায়নি। এই যুক্তি পাল্টা আসা স্বাভাবিক। এই ক্ষেত্রে খড়গ্রামের বিজেপি বিধায়ক মিতালি পালের স্বামী মিঠুন ঘোষের বক্তব্য শুনতে হবে। মিঠুন খড়গ্রামে বিজেপি’র ৩ নং মণ্ডলের সভাপতি। তাঁর কথায়, ‘‘একটি সাধারণ গোরু ৩ বছর থেকে গর্ভবতী হয়। দেড় বছর পরপর সে এঁড়ে কিংবা বকনার জন্ম দিতে পারে। একটি সাধারণ গোরু এমনভাবে বড় জোর ৬ বার গর্ভবতী হতে পারে। তারপর তার দুধ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। তখন সে আর চাষীর কাছে লাভজনক নয়। তখন সেই গোরু চাষী বিক্রি করতে চায়। বিক্রি করে আবার গোরু কিনতে পারে। আবার নাও পারে। সেই টাকা তাঁর বাড়ির প্রয়োজনে খরচ করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাষী অভাবী বলেই সেই গোরু বিক্রি করে।’’ রাজ্যের বিজেপি সরকারের সিদ্ধান্তে তাহলে চাষী বিপদে পড়লো? বিজেপি’র মণ্ডল সভাপতি, বিধায়কের স্বামীর পক্ষে এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বলেছেন, ‘‘দেখা যাক কী হয়।’’

গোপালকরা বেজায় ক্ষুব্ধ, সে খবর তাঁর কাছে আছে। এই গোপালকদের বড় অংশই গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি’কে ভোট দিয়েছেন। বিজেপির এই সিদ্ধান্ত কী ‘গো মাতা রক্ষা’ অভিযানের অংশ? রাজ্যের সরকারে হস্তক্ষেপ জোরদার করতে চাওয়া আরএসএস-কে খুশি করতেই তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত, এমন আশঙ্কাজনক মতামতই শোনা যাচ্ছে প্রশাসনিক অঙ্গনে। কিন্তু তা সারা দেশের ক্ষেত্রে এক হওয়া উচিত। হয়নি। গোরু পাচার আটকাতে এই সিদ্ধান্ত। না, তাও নয়। তার জন্য পুলিশ, বিএসএফ আছে। গোরু কেনাবেচায় কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। সরকারের এক সিদ্ধান্তে তা কার্যত বন্ধ। উল্টে গোপালকদের জীবন দুর্দশায় পড়েছে। সামগ্রিক ভাবে উপযুক্ত পরিকাঠামো না গড়ে রাজ্যের সরকারের এই সিদ্ধান্ত হঠকারী হয়েছে।

রাজনীতির মেরুদণ্ড অর্থনীতি। তাই আবার গোরুর অর্থনীতিতে ফিরি। একটি গোরু সাধারণত ১০-১১ বছরের পর দুধ দেওয়া কমিয়ে দেয়। তখন সে যা দুধ দেয়, তার দামের থেকে তার খাওয়া খরচ বেশি হয়ে যায়। একটি গোরু তখন সর্বনিম্ন ৪০ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ প্রায় ১ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়। সেই বিক্রি হিন্দুও করে, মুসলমানও করে। আর এঁড়ে? অর্থাৎ পুরুষ গোরু। তাকে ঘরে রেখে লাভ নেই। ভরত ঘোষের কথায়, ‘‘এঁড়ে পুষে চাষীর লাভ নেই। আজকাল কেউ মাঠে গোরু দিয়ে লাঙল ঠেলে না। ট্রাক্টর এসে গেছে অনেকদিন। ফলে একটি এঁড়ের বয়স ২ বছর হলেই বিক্রি করা হয়। ৩-৪ বছরের মধ্যে তো বিক্রি হয়ই। ২-৩ বছরের এঁড়ে বিক্রি করে ৩০ থেকে ৫০ হাজারের মধ্যে টাকা পাওয়া যায়।’’

সেই বিক্রিও বন্ধ। ‘‘চাষী ঘরের পয়সায় দুধ কমে যাওয়া, অক্ষম গোরু এবং এঁড়েদের খাওয়াচ্ছেন। এই ভাবে কিছুদিন চললে চাষী নিজেই খেতে পাবেন না, গোরু, বাছুরকে কী করে খাওয়াবে? রাখবেই বা কোথায়? চাষীকে গোপালন ছাড়তে হবে। যেভাবে কৃষক ধান চাষ ছাড়ছেন, সেদিকেই যাবে বিষয়টি।’’ বললেন অনিল পাল। তিনিও দুগ্ধচাষী, তবে বর্ধমানের আউশগ্রামের।

হবে কী তাহলে? দুগ্ধচাষীরা একজোট হচ্ছেন। রাজ্যের ‘যাদব সমিতি’র সদস্য, বিজেপি’র বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষের মতো প্রভাবশালী মানুষও আটকাতে পারছেন না। দুগ্ধচাষীদের বক্তব্য, প্রথমত, সরকার পশু চিকিৎসকদের শংসাপত্রের কথা বলেছেন। রাজ্যে পশু চিকিৎসকের দারুণ অভাব। তার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেশিরভাগ পঞ্চায়েত সমিতি দখল করে বসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরে পঞ্চায়েত সমিতির সেই তৃণমূলী সভাপতিরা আর অফিসে আসছেন না। তাঁদের সই জোগাড়ের দায়িত্ব প্রশাসনকেই নিতে হবে। তৃতীয়ত, এঁড়ে গোরু কিংবা অক্ষম গোরু, যার বয়স ১৪ হয়নি, তাদের সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.