Shopping cart

অধুনা

সাংবাদিকরূপেণ সংস্থিতা

650

গোদরেজের একটি বক্স টিভি। ঝিরঝির করলেই মাথায় সপাটে একটা বাড়ি। টিভিটা বেশ নড়েচড়ে বসে চালাতে শুরু করতো, ‘ঘরোয়া’, ‘কথায় কথায়’, ‘দর্শকের দরবারে’… পর্দায় চৈতালি দাশগুপ্ত, শাশ্বতী গুহঠাকুরতাদের দেখে তখন চোখের পলক ফেলতে পারতো না স্কুলফেরতারা। রবিবার আকাশ ৮-এর পর্দায় ‘লক্ষ্মীছানা’য় হরেকরকম খেলাধুলার পসরা সাজিয়ে তখন বসছেন সুজন মুখার্জি (নীল)। কিন্তু পাত্তা নেই সেদিকে। অপেক্ষা তখন ‘সাপ্তাহিকী’ দেখার। প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীদের চোখে তখন থেকেই রং। স্বপ্ন, মাথায় ফুল, গলায় হার, পাটে পাটে শাড়ি পরে সাবলীল ভঙ্গিতে হয়ে উঠতে হবে চৈতালি দাশগুপ্ত। ‘বোল্ড’ হতে হবে শাশ্বতী গুহঠাকুরতার মতো। গড়গড় করে খবর বলতে হবে ‘খাসখবর’-এর সুদীপ্তা চক্রবর্তীর আদলে। ‘বড় হয়ে কী হতে চাও?’ রচনার প্রথম লাইনে তখন একটাই বাক্য। ‘সাংবাদিক হতে চাই’। বয়স গড়াতে সেই ‘সাংবাদিক হতে চাই’-এর ভূত কারোর মাথা থেকে নামলেও কিছু মুষ্টিমেয় অষ্টাদশীর জেদ চেপে গেল। হতেই হবে রোদ্দুর। অমলকান্তি হওয়া যাবে না কিছুতেই।

ব্যাস! গন্ডগোল বাঁধলো সেখানেই। রোদ্দুর হওয়ার জেদের চক্করে ভুলেই গেলো, বিজ্ঞান বইয়ের সেই অমোঘ বাণী- নিউক্লীয় ফিউশন প্রক্রিয়া ছাড়া রোদ বা সূর্যালোক তৈরিই হয় না। অর্থাৎ পকেটে যেখানে ফুটো কড়ি, ফোনে নেই কনট্যাক্টসের বহর, সিভির ওপরে পেন দিয়ে লেখার মতো নেই একটাও রেফারেন্স, সেখানে সাংবাদিক হতে চাওয়া মহাকাশ ছোঁয়ার সমান! এখানেই স্বপ্ন মারা গেল এই মুষ্টিমেয় অষ্টাদশীর মধ্যে কয়েকজনের। পড়ে থাকল হাতে গোনা কিছু, যারা তখনও বিশ্বাস করে, ‘কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে’। কেষ্ট মিললো ঠিকই। কিন্তু ইতিমধ্যেই স্বপ্ন বাস্তবের মাটিতে পা দিয়ে ফেলেছে। বুঝে গেছে, মেকআপ সেরে এসি ঘরে বসে দক্ষতার সঙ্গে সঞ্চালনার বাইরেও সাংবাদিকতার একটা জগৎ আছে। যে জগতে কী-লাইট, ফিল-লাইট, ব্যাক-লাইট ছাড়া আলো নেই খুব একটা। সেই সময় যে মফস্বলের মেয়েরা ভোটের হাওয়ায় শহরের বুকে রাজনীতির গন্ধ খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল, তারা বুঝে গেল ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসের সামনে ব্যারিকেড ঘেঁষে যে খান পঞ্চাশেক ক্যামেরা দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে জায়গা করতে গেলে বেগ পেতে হবে। কারণ বুম হাতে যে তাবড় তাবড় রিপোর্টাররা তখন সেখানে হাসছেন, গল্প করছেন, পরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করছেন, তাঁরা সকলেই পুরুষ। হাওয়ায় তখন সমালোচনার বহর, ‘ধুস, মহিলারা আবার রিপোর্টার হবে! ফিল্ড করবে! ডেস্কটা তবুও চলে। দু’দিনেই ফুটে যাবে, দেখিস!’ লিঙ্গ বৈষম্যের সেই অলিখিত পাঁচিল ভাঙতে তখন কাজ করা শুরু হল দ্বিগুণ উদ্যমে। কিন্তু টিকে থাকার লড়াই তো শেষ হওয়ার নয়। জেলার হাওয়ায় বেড়ে ওঠা মেয়েদের কি রাজধানীর হাওয়া এত সহজে মেনে নেয়? এত সহজেই কি পুরুষশাসিত মিডিয়ার বাজারে দাপটের সঙ্গে হয়ে ওঠা যায় চৈতালি দাশগুপ্ত, শাশ্বতী গুহঠাকুরতা, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, বরখা দত্ত কিংবা রাধিকা রায়? বলে দেওয়া যায়, ‘যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে?’

সালটা ২০২৩। সদ্য স্নাতক শেষ। চোখে তখন বরুণ সেনগুপ্ত, জয়ন্ত ঘোষাল, সুমন দে, অঞ্জন বন্দোপাধ্যায়। বয়স ২০ ছাড়িয়েছে। যখন ওই অষ্টাদশীদের একজন হয়ে একটি মিডিয়া হাউজের কর্মী হিসেবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন বুঝলাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের গ্রাম থেকে শুধু আমি একাই সেক্টর-ফাইভের জঙ্গলে শামিল হইনি। বর্ধমানের নন্দিতা, বারুইপুরের পূজিতা, ভাঙড়ের তমালি, কোচবিহারের দীপান্বিতাদের চোখেও তখন ‘খাস খবর’, ‘ভালো খবর’-এর হাতছানি। ডেডলাইন, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, তাঁবেদারি, জবাবদিহির নীতিতে নিঃশ্বাস নিতে তখন কেউ কেউ ডিজিটাল মিডিয়ার দৌলতে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথও বেছে নিচ্ছে। সেখানেও বিপত্তি। সাংবাদিক হতে হলে উচ্চারণে থাকবে না মেদিনীপুরের টান, থাকবে না বাঁকুড়ার সুর। চলবে না সিলেটি বা ককবরক। শুদ্ধ বাংলা চলতি ভাষায় খবর না বললে, রাজনৈতিক নেতাদের তুখোড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে না পারলে দর্শক বা শ্রোতারা ‘খাবে’ না। টিআরপি কমবে চ্যানেলের। তাই মেয়েবেলা মফস্বলে কাটায় যাদের উচ্চারণে ছিল না পশ ভাব, তারা ইন্টারভিউ রাউন্ডেই বাতিল পড়তে শুরু করল। যারা নিজেদের গুণ এবং জ্ঞানের জোরে টিকে গেল, তাদের আবার পিছু ছাড়লো না ব্যঙ্গ। বুম নিয়ে বেরোলেই সহকর্মীদের চোখ টেপাটেপি, ব্যাঁকা হাসি, আরও কত কিছু!

ভোট আসে, ভোট যায়। রাজা আসে, রাজা যায়। সাংবাদিকরা আসেও না, যায়ও না। তারা থেকে যায়। তাদের দিন বদলায় না। অভিজ্ঞতা বাড়ে, কন্ট্যাক্ট লিস্টে বাড়ে ফোন নম্বর, বাইলাইনের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যায় নাম, নেশাগত পেশার দৌলতে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তলানিতে পড়ে থাকে ক্রেডিট। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে যখন ‘পাল্টানো দরকার’, ‘সেই জেতাবে বাংলা মেয়েকে’, ‘আসছে কলতান’-এর মধ্যে ম্যারাথন চলছে তখন সেই অষ্টাদশীরা বড় হয়ে গিয়েছে। তাঁদের অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরেছে নিত্যনতুন সম্ভারে। প্রথমবার প্রশ্ন করতে গিয়ে যে তুতলে যাওয়া, অল্প অল্প বুক ধুকপুক, অত্যাধিক নড়াচড়ায় ক্যামেরার ফ্রেম ঘেঁটে ফেলা- সেইসব এখন অনেক নিয়ন্ত্রণে। সামনে নিপাট ভালোমানুষ থাকুক কী নটোরিয়াস ক্রিমিনাল, কলকাতার অভিজাত পাড়া হোক কিংবা গোসাবার কোনও অজ গাঁ, কাজের কারণে কোথাও যেতে আর বিশেষ ভয় কিংবা সংকোচ কাজ করে না। সেজন্যই সর্বভারতীয় নেতৃত্ব হোক বা টানা বৃষ্টিতে রেললাইনের পাশে দু’মুঠো ভাতের খোঁজে কোলে সন্তান নিয়ে থাকা মা, সকলের সঙ্গেই সহজে মিশে যাওয়া শিখে নিতে হয়। ২০২৪’এর লোকসভা নির্বাচন কভারে নামার সময়েই বুঝে নিতে হয়, কু-চাহনি, নেতাদের হুমকি-চোখরাঙানি পেরিয়ে রাজার নীতিকে আপন নীতি করে নেওয়াই সাংবাদিকতার ভিত। ব্যক্তিগত গাড়ির বিশেষ সুবিধা সকলের নয়। অন্তঃসত্ত্বাদেরও দেখেছি, প্রচন্ড ভিড়ে কার্যত গুঁতোগুঁতি করে ঝোলায় বুম ভরে বাসে-ট্রেনে যাতায়াত করতে। দেখেছি, উচ্চারণে অঞ্চলভিত্তিক টান থাকায় বাইট রেকর্ডিংয়ের সময় ক্যামেরাপার্সনদের ঠ্যালাঠেলিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছোতে লেগে গিয়েছে কয়েক ঘন্টা। বৃষ্টিতে চপচেপে ভিজে অবস্থায় লোকেশনে পৌঁছে জানা গিয়েছে, যার ইন্টারভিউ নিতে আসা, তিনি মাত্র পাঁচ মিনিট আগেই বেরিয়ে গিয়েছেন। ভাঙড়, যাদবপুর থেকে শুরু করে দেশের ৫৪৩টি লোকসভা আসনে নির্বাচন হোক, কিংবা রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভায় ভোট হোক, কিংবা আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ভরা বন্যায় কোমর সমান জলে পাঁশকুড়া-ঘাটালে দাঁড়িয়ে ব্রেকিং হোক, সামনে বাধা দেখলেই মন্ত্র জপতে হয়েছে, ‘আমি নারী, আমি সব পারি।’ আবার ৩৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভরা ডিজিটাল যুগে হাড়োয়ার বুকে দাঁড়িয়ে শুনতে হয়েছে পরামর্শও, ‘এইসব কাজ করলে বিয়ে হবে না কিন্তু! বাড়ি যাও।’

তাহলে প্রশ্ন আসে, কেন এতসবের পরেও লড়াই চালিয়ে যাওয়া? কারণটা কি শুধুই স্বপ্ন? উত্তরটা ‘না’। হৃদয়ের অগাধ ভারের মধ্যে যখন উঁকি দেন গোসাবার সেই গর্ভবতী বৌদি, যিনি শুধু আমার জন্য পুকুর থেকে বালতি ভরে জল বয়ে নিয়ে এসেছিলেন, যখন মনে পড়ে চলতি নির্বাচনকালে মন্দিরবাজারের সেই দিদার কথা, যিনি বাড়ির উঠোনে বসিয়ে নিজে না খেয়ে বলেছিলেন, ‘মা মুখ-চোখ শুকিয়ে গিয়েছে। একটু ডাল ভাত খেয়ে যা’, যখন চোখে ভাসে গোবর্ধনপুরের সেই বাচ্চাগুলো, যাদের সাইকেলের পিছনে বসে মিডডে-মিলহীন স্কুলের গল্প শুনতে শুনতে পৌঁছে গিয়েছিলাম ফেরিঘাটে, ঠিক তখন ফুটো পকেটে সাংবাদিকতা শিখতে শিখতে নিজেকে বড্ড ধনী মনে হয়। মনে হয়, ক্লান্তবর্ষণ কাকডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর হতে না পারি, অমলকান্তির অন্ধকারকে চেনার ক্ষমতা তৈরি করতে পেরেছি। ঠিক একইভাবে সেই অন্ধকারকে চিনে বিধায়ক-সাংসদদের দোরগোড়ায় বসে রোদ্দুর হওয়ার অপেক্ষা করে যাচ্ছে সানিয়া, তমালি, দ্বীপানিতা, লক্ষ্মীর মতো অষ্টাদশীরাও, যারা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন হতে চায় রোজ। যাদের দেখলে কবীর সুমনের লাইন ধার করে প্রতি মুহূর্তে বলতে ইচ্ছে করে, ‘যে যেখানে লড়ে যায়, আমাদেরই লড়া’।

সম্পর্কিত ট্যাগ:

সম্পর্কিত খবর