কখনও খুব কাছ থেকে কোনো দক্ষ জাদুকরের তাসের খেলা খেয়াল করেছেন? জাদুকর যখন তাসের বান্ডিলটা আপনার সামনে মেলে ধরে হাসিমুখে বলেন, “যেকোনো একটা তাস বেছে নিন,” আপনি তখন নিজেকে দারুণ ক্ষমতাবান ভাবেন। আপনি অনেক ভেবেচিন্তে, নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় একটা তাস তুলে নেন। কিন্তু খেলা শেষে যখন জাদুকর ঠিক ওই তাসটাই আপনার পকেট থেকে বের করে আনেন, তখন আপনি বুঝতে পারেন যে পুরো নিয়ন্ত্রণটাই আসলে তাঁর হাতে ছিল। জাদুকর অত্যন্ত সুকৌশলে, আপনার মনের গতিবিধি বুঝে ঠিক ওই নির্দিষ্ট তাসটাই আপনার হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন। আমাদের আজকের দিনের তথাকথিত গণতান্ত্রিক নির্বাচন আর এই ভোটের বাজারের গল্পটাও ঠিক ওই জাদুকরের তাসের খেলাই। আমরা সকালে সেজেগুজে, ভোটার কার্ড হাতে নিয়ে বুথে গিয়ে ইভিএম মেশিনের বোতামটা টিপে ভাবি, আমরা আমাদের স্বাধীন ভোটাধিকার প্রয়োগ করলাম। কিন্তু রূঢ় সত্যিটা হলো, ওই বোতামটা আপনি কোনটা টিপবেন, আর কেন টিপবেন—তার মনস্তাত্ত্বিক ছক কষা হয়ে গেছে অনেক আগে থেকেই। এবং সেটা কোনো ম্যাজিক নয়, একেবারে নিরেট, নিখুঁত এবং বৈজ্ঞানিক মগজধোলাই বা ‘ব্রেনওয়াশিং’-এর মাধ্যমে।
তবে ভাবলে অবাক হতে হয়, এই মগজধোলাইয়ের ফর্মুলাটা শুধু আমাদের দেশের পেটেন্ট করা কোনো বিষয় নয়। এটি আজ আক্ষরিক অর্থেই একটি গ্লোবাল ফ্র্যাঞ্চাইজি। আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রাজিলের জাইর বলসোনারো, হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান কিংবা তুরস্কের এরদোয়ান—এঁরা প্রত্যেকেই যেন একই চিত্রনাট্য মেনে রাজনীতি করছেন, আর আমাদের দেশের বর্তমান রাষ্ট্রনেতারাও সেই একই বৈশ্বিক ছকের এক অত্যন্ত সফল ভারতীয় সংস্করণ। এই ডানপন্থী ইকোসিস্টেম ঠিক কীভাবে দিনের পর দিন আমাদের চোখের সামনে আমাদেরই মন নিয়ে এই মগজধোলাইয়ের খেলাটা খেলে যাচ্ছে, কীভাবে তারা আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে যে তারাই আমাদের একমাত্র ত্রাতা, আসুন আজ কোনো ভারী তত্ত্বের কচকচি ছাড়া একটু সহজ করে সেই আড্ডাই দেওয়া যাক।
এই মগজধোলাইয়ের প্রথম এবং প্রধান ধাপটি হলো—একটি ভুতুড়ে সংকটের জন্ম দেওয়া। আপনি যদি কাউকে একটি দামি ওষুধ বিক্রি করতে চান, তবে তার আগে আপনাকে বিশ্বাস করাতে হবে যে লোকটির এমন এক ভয়ংকর রোগ হয়েছে যা থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। ঠিক এভাবেই, ফ্যাসিবাদী বা উগ্র ডানপন্থী শক্তিগুলো মানুষের মনে এক তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের জন্ম দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলট তাঁর ‘মোদীস ইন্ডিয়া’ বইতে এর নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বর্তমান ভারতে কীভাবে সুকৌশলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে এক কাল্পনিক ‘ভিকটিমহুড’ বা বঞ্চনার বোধ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। শত শত বছরের পরাধীনতা, মুঘল শাসন বা ব্রিটিশ রাজের ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বরাবরই নিপীড়িত। এই ঐতিহাসিক অপমানের জ্বালা থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়ে বলা হয়, “তোমাদের ধর্ম বিপদে, তোমাদের সংস্কৃতি বিপদে, ওরা বেশি করে বাচ্চা জন্ম দিচ্ছে, একদিন তোমরা নিজেদের দেশেই সংখ্যালঘু হয়ে যাবে।”
মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, মানুষের মনে যখন আদিম অস্তিত্ব রক্ষার ভয় জন্মায়, তখন তার যুক্তিবাদী মস্তিষ্ক বা প্রি – ফ্রন্টাল কাজ করা বন্ধ করে দেয়। যখন আপনার মনে এই ভয় ঢুকে গেল, তখন দেশের বেকারত্ব, জিনিসপত্রের আগুন দাম, বা হাসপাতালের বেডের অভাবের কথা আপনার আর মনে থাকে না। আর ঠিক এই ভয়ের চোরাবালিতে দাঁড়িয়েই জন্ম হয় এক মসিহা বা ত্রাতার। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান নিয়ে প্রখ্যাত মার্কিন মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন হাসান তাঁর ‘দ্য কাল্ট অফ ট্রাম্প’ (The Cult of Trump) বইতে দেখিয়েছেন, কীভাবে ট্রাম্প আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী মানুষদের এই ভয় দেখিয়ে বলেছিলেন, “একমাত্র আমিই তোমাদের বাঁচাতে পারি” (I alone can fix it)। তিনি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন ‘কাল্ট লিডার’ বা ধর্মগুরু। আমাদের দেশেও ঠিক একই কায়দায় একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতাকে ‘বিশ্বগুরু’, ‘ফকির’ বা দেশের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রজেক্ট করা হয়েছে। জ্যাফ্রেলট একেই বলেছেন ‘ন্যাশনাল পপুলিজম’। যখন বলা হয় “মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়”, তখন আসলে নেতার প্রতি ভক্তি, ধর্মের প্রতি ভক্তি আর দেশের প্রতি ভক্তি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। নেতা তখন আর কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন দেবতুল্য। তাঁর যেকোনো সমালোচনা মানেই যেন দেশের বা ধর্মের অপমান।
কিন্তু এই ভয় আর ভক্তি তো আর হাওয়ায় ভাসে না, তাকে মানুষের মগজে ইনজেক্ট করতে হয়। তার জন্য তো আর হাটে-বাজারে মিটিং করার দরকার নেই; সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে শুতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের হাতের স্মার্টফোনটাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সাইকোলজিক্যাল জেলখানা। স্টিভেন হাসান তাঁর ‘বাইট মডেল’ (BITE Model)-এ যে ইনফরমেশন বা তথ্য নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন, আজ তা বাস্তবায়িত হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। আপনি হোয়াটসঅ্যাপ খুললেই দেখছেন একটা মেসেজ ফরোয়ার্ড হয়ে আসছে— “আমাদের ধর্ম বিপদে! অমুক জায়গার ইতিহাস আসলে আমাদের ছিল, ওরা দখল করেছে।” ভাবছেন এগুলো নেহাতই কাকতালীয় বা সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ? একদমই নয়। হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা রীতিমতো পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করেছেন এই ভয়াবহতার মাত্রা। হার্ভার্ডের ‘মিসইনফরমেশন রিভিউ’-এর একটি বিস্তারিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের রাজনৈতিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে প্রতিদিন যে ছবিগুলো ছড়ানো হয়, তার অন্তত ১৩ শতাংশই হলো ডাহা মিথ্যে বা ফেক নিউজ। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, ডানপন্থী গ্রুপগুলোতে শেয়ার হওয়া এই ভুয়া ছবিগুলোর মূল কাজই হলো দুটি—এক, বিরোধী দল বা নির্দিষ্ট একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে চূড়ান্ত দানব হিসেবে তুলে ধরা; এবং দুই, নেতার ইমেজকে ঈশ্বরের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষণায় স্পষ্ট দেখা গেছে, নির্বাচনের আগে প্রো-বিজেপি ফেসবুক পেজগুলোতে শেয়ার করা লিংকের ২৮ শতাংশই হলো আদ্যোপান্ত ‘জাঙ্ক নিউজ’ বা উসকানিমূলক খবর। এমনকি, কম্পিউটার সায়েন্সের গবেষকরা প্রমাণ করেছেন কীভাবে অন্তত ৬০০টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে টুইটার বা এক্সে (X) কৃত্রিমভাবে ট্রেন্ড তৈরি করা হয়, যাতে মনে হয় গোটা দেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথাগুলো বলছে। রবার্ট জে. লিফটন তাঁর গবেষণায় একেই বলেছিলেন ‘মিলিউ কন্ট্রোল’ (Milieu Control) বা পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ। আপনার চারপাশের তথ্যপ্রবাহকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যে আপনি একটা ‘ইকো চেম্বার’ বা বদ্ধ কুয়োর মধ্যে ঢুকে যান। বারবার একটা মিথ্যে কথা শুনতে শুনতে আপনার অবচেতন মন সেটাকেই পরম সত্য বলে মেনে নেয়।
এই বদ্ধ কুয়োর মধ্যে পড়ে মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ধীরে ধীরে পঙ্গু হয়ে যায়। রবার্ট জে. লিফটন তাঁর তত্ত্বে এর একটা দারুণ নাম দিয়েছেন— ‘লোডিং দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ’ (Loading the Language) বা এমন কিছু শব্দবন্ধ তৈরি করা যা মানুষের চিন্তার পথ একেবারে বন্ধ করে দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন তাঁর বিরোধীদের বা স্বাধীন মিডিয়াকে ক্রমাগত “ফেক নিউজ” বা “উইচ হান্ট” বলে দেগে দিতেন। আমাদের দেশে এই শব্দবন্ধগুলো হলো— ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আরবান নকশাল’, ‘টুকড়ে-টুকড়ে গ্যাং’ বা ‘দেশদ্রোহী’! আপনার চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা হয়তো সরকারের কোনো নীতির একটু যৌক্তিক সমালোচনা করলেন। সাথে সাথে তাঁদের দিকে এই শব্দবাণগুলো ধেয়ে আসে। যেই মুহূর্তে কাউকে ‘আরবান নকশাল’ দাগিয়ে দেওয়া হলো, আপনি অবচেতনভাবেই ধরে নিলেন লোকটি খারাপ; তার কথা আর শোনার বা যুক্তি দিয়ে বিচার করার কোনো প্রয়োজন নেই। এভাবেই অত্যন্ত সুকৌশলে সমাজের ভিন্নমতকে খতম করে দেওয়া হয়। লিফটন একেই বলেছেন ‘Dispensing of Existence’, অর্থাৎ তুমি যদি আমার মতাদর্শের না হও, তবে এই দেশে তোমার বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই নেই।
তবে আমেরিকার সাথে ভারতের এই মগজধোলাইয়ের একটা খুব মৌলিক ও ভয়াবহ পার্থক্য আছে। আমেরিকায় এটা অনেকটা মিডিয়া আর ইন্টারনেট নির্ভর হলেও, ভারতের এই রাজনৈতিক ব্রেনওয়াশিং-এর শেকড় সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত। আমাদের দেশে এই কাজটা কেবল ওপরতলা থেকে বা টিভির মাধ্যমে হয় না। গবেষক বদ্রী নারায়ণ তাঁর ‘রিপাবলিক অফ হিন্দুত্ব’ বইতে এবং ওয়াল্টার অ্যান্ডারসন ও শ্রীধর দামলে তাঁদের ‘দ্য ব্রাদারহুড ইন স্যাফ্রন’ বইতে দেখিয়েছেন, সংঘ পরিবারের মতো সংগঠনগুলো গত এক শতাব্দী ধরে কীভাবে একেবারে তৃণমূল স্তরে গিয়ে কাজ করেছে। তারা শুধু শহরের উচ্চবর্ণের ড্রয়িংরুমে আটকে নেই। বদ্রী নারায়ণ চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন, কীভাবে আরএসএস এবং তাদের শাখা সংগঠনগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে দলিত, আদিবাসী এবং পিছিয়ে পড়া সমাজের মানুষদের ছোট ছোট স্থানীয় লোককথা, মিথ বা বীরত্বের ইতিহাসগুলোকে হিন্দুত্বের বড় ছাতার তলায় নিয়ে এসেছে। রাজা সুহেলদেব বা শবরী মাতার মতো প্রান্তিক আইকনদের নতুন করে পুজো করা শুরু হয়েছে। যে মানুষটা যুগে যুগে সমাজে অবহেলিত হয়ে এসেছে, যার কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না, তাকে যখন বলা হচ্ছে, “তুমি শুধু একজন দলিত নও, তুমি মহান হিন্দু ধর্মের একজন রক্ষক, তুমি রামের সেনানী,” তখন সেই মানুষটা এক অদ্ভুত ক্ষমতায়ন বা এমপাওয়ারমেন্ট অনুভব করেন। তাঁর হাতে যখন ধর্মের ঝান্ডা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন তিনি নিজের হাজার বছরের জাতপাতের বঞ্চনা ভুলে গিয়ে অপর একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আধিপত্য ফলানোর কাল্পনিক সুখে মজে থাকছেন। এর ফলে প্রান্তিক মানুষরাও এই ডানপন্থী রাজনীতির অংশ হতে পেরে নিজেদের ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করছেন। তাঁরা শুধু বাধ্য হয়ে নয়, বরং স্বেচ্ছায় এই উগ্র জাতীয়তাবাদের শরিক হচ্ছেন।
একেই সমাজতাত্ত্বিকরা বলেন “Willing Ethnic-Nationalists”। জ্যাফ্রেলট একেই বলেছেন ‘এথনিক ডেমোক্রেসি’ বা জাতিগত গণতন্ত্র। অর্থাৎ, দেশটা সংবিধানে সবার হলেও, পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে এই দেশটা আসলে কেবল হিন্দুদের, আর বাকিরা এখানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকবে। এই তৃণমূল স্তরের আবেগ আর মনস্তাত্ত্বিক ইঞ্জিনিয়ারিং এতটাই নিখুঁত যে, সাধারণ মানুষ নিজের পেটের খিদে আর বঞ্চনার কথা ভুলে গিয়ে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে এই রাষ্ট্রনেতাই তাঁদের হারানো আত্মসম্মান ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে নিরাপদ রাখার জন্য প্রয়োজন হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সম্পূর্ণ দখলদারি। কারণ শুধু ব্রেনওয়াশ করে তো আর সব ভোট জেতা যায় না, মাঝে মাঝে মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে। ঠিক তখনই কাজে লাগে সাংবাদিক ক্রেইগ আঙ্গার তাঁর ‘আমেরিকান কমপ্রোম্যাট’ (American Kompromat) বইতে দেখানো সেই প্রাতিষ্ঠানিক দখলের (Institutional capture) ছক। আমেরিকায় কীভাবে ‘ওপাস ডেই’ বা ‘ফেডারেলিস্ট সোসাইটি’-র মতো অতি-রক্ষণশীল সংগঠনগুলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি থেকে শুরু করে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিজেদের লোক বসিয়েছিল, ভারতেও ঠিক সেই একই মডেল কাজ করছে। স্টিভেন লেভিটস্কি ও লুকান এ. ওয়ে তাঁদের গবেষণায় একেই বলেছেন— ‘কম্পিটিটিভ অথরিটারিয়ানিজম’ বা প্রতিযোগিতামূলক স্বৈরতন্ত্র। এই ব্যবস্থায় সরাসরি মিলিটারি শাসন থাকে না, ঘটা করে ভোটও হয়, বিরোধীরাও ভোটে দাঁড়ায়। কিন্তু মুশকিল হলো, খেলার মাঠটা একদম একপেশে (Uneven playing field) হয়ে যায়। রেফারি থেকে শুরু করে লাইন্সম্যান—সবাই আগে থেকেই কেনা। নির্বাচন কমিশন, আদালত, পুলিশ এবং সিবিআই বা ইডি-র মতো তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে কবজা করে নেওয়া হয়। বিরোধী দলের নেতাদের জেলে পোরা হয়, নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়, আর কর্পোরেট মিডিয়াকে বাধ্য করা হয় একতরফা প্রচার চালাতে। ফলে, আপনি ইভিএম-এর সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছেন আপনি নিজের স্বাধীন ভোটটি দিচ্ছেন, কিন্তু আসলে আপনি একটি অসম এবং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত সিস্টেমে অংশ নিচ্ছেন মাত্র, যেখানে বিরোধীদের হাত-পা আগে থেকেই বেঁধে রাখা হয়েছে।
কিন্তু এই পুরো মনস্তাত্ত্বিক আর প্রাতিষ্ঠানিক খেলাটার পেছনের আসল উদ্দেশ্যটা কী? কেন এই কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমাদের মগজধোলাই করা হচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে অর্থনীতির গহিনে। স্টুয়ার্ট করব্রিজ এবং জন হ্যারিস তাঁদের ‘রিইনভেন্টিং ইন্ডিয়া’ বইতে দেখিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকের অর্থনীতির উদারনীতিকরণের (Liberalization) পর থেকেই ভারতের রাজনীতিতে এই হিন্দু জাতীয়তাবাদের এক অদ্ভুত উত্থান ঘটতে থাকে। একে তাঁরা বলেছেন ‘এলিট রিভোল্ট’ বা উচ্চবিত্তের বিদ্রোহ। যখন মণ্ডল কমিশন বা নিম্নবর্ণের মানুষের অধিকারের দাবিতে রাজনীতি উত্তাল হয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই রাম জন্মভূমি আন্দোলনকে সামনে আনা হয়। আসলে, এই উগ্র জাতীয়তাবাদ হলো চরম পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। যখন দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় কয়েকজন কর্পোরেট পুঁজিপতির পকেটে চলে যাচ্ছে, যখন দেশের যুবসমাজ বেকারত্বের জ্বালায় ধুঁকছে, তখন মানুষের ক্ষোভ যাতে কর্পোরেট বা সরকারের দিকে না যায়, তার জন্যই এই মগজধোলাইয়ের প্রয়োজন। আপনাকে হিন্দু-মুসলমান বিতর্কে, রামমন্দির উদ্বোধনের আবেগে, আর উগ্র দেশপ্রেমের নেশায় বুঁদ করে রাখা হয়, যাতে আপনি প্রশ্ন করতে ভুলে যান যে আপনার বাড়ির ছেলেটার চাকরি কেন হলো না। ট্রাম্প যেমন আমেরিকায় “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” (MAGA) বলে শ্বেতাঙ্গদের অতীত গৌরবের স্বপ্ন দেখিয়ে কর্পোরেটদের কর ছাড় দিয়েছিলেন, আমাদের দেশেও ঠিক তেমনি “অমৃতকাল”-এর স্বপ্ন দেখিয়ে দেশের জল-জঙ্গল-জমি বেচে দেওয়া হচ্ছে অত্যন্ত সন্তর্পণে।
এই যে আমরা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে এই নিশ্ছিদ্র মগজধোলাইয়ের শিকার হচ্ছি, এর থেকে কি আদৌ কোনো মুক্তির উপায় আছে? বিখ্যাত দার্শনিক গুরজিয়েফ বলতেন, পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষই আসলে ‘ঘুমিয়ে’ আছে। তাঁরা যান্ত্রিকভাবে জীবন কাটান, রোবটের মতো কাজ করেন, আর ভাবেন যে তাঁরা স্বাধীন। আজকের পৃথিবীর, বিশেষ করে ভারতীয় ভোটারদের অবস্থাও ঠিক তাই। আমরা অ্যালগরিদম, ফেক নিউজ, আর ভয়ের রাজনীতির আফিম খেয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় হেঁটে গিয়ে ইভিএম-এর বোতাম টিপে আসছি। আমাদের এই ঘুমন্ত অবস্থার সুযোগ নিয়েই রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার, আমাদের মানবিকতা কেড়ে নিচ্ছে।
এই মগজধোলাইয়ের রূপকথা থেকে বেরিয়ে আসার একটাই উপায়—নিজেদের মনকে সজাগ করা এবং প্রশ্ন করতে শেখা। জাদুকরের তাসের খেলাটা ধরে ফেলা। হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজটা পড়ে অন্ধের মতো বিশ্বাস করার আগে বা অন্যকে ফরোয়ার্ড করার আগে অন্তত একবার থমকে দাঁড়ানো। যখনই টিভি বা মোবাইলের পর্দায় কেউ চিৎকার করে বলবে ‘দেশ বিপদে’, ‘ধর্ম বিপদে’, তখন লাফিয়ে না উঠে শান্ত হয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করা— দেশের সাধারণ মানুষগুলো দু’বেলা খেতে পাচ্ছে তো? হাসপাতালের বেডগুলো খালি আছে তো? যেদিন আমরা ভয়ের বদলে যুক্তি দিয়ে, অপরের প্রতি ঘৃণার বদলে নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে ভোট দিতে শিখব, যেদিন আমরা বুঝব যে দেশপ্রেম মানে অন্যকে গালমন্দ করা নয় বরং দেশের মাটিকে ভালোবাসা—সেদিনই কেবল ওই ইভিএম-এর বোতাম টেপার অধিকারটা সত্যিই আমাদের নিজের হবে। তার আগে পর্যন্ত, আমরা কেবল নিখুঁতভাবে রিমোট কন্ট্রোলে চালানো এক একটি পুতুল মাত্র, যাদের সুতোটা বাঁধা আছে ওই বিশ্বব্যাপী ডানপন্থী মগজধোলাইয়ের এক অদৃশ্য নাটাইয়ে।








