Shopping cart

  • Home
  • অধুনা
  • বহুত্বের মধ্যে একতা: বইয়ের পাতায় বন্দি সংবিধানের স্বপ্ন, রাজপথে রক্তাক্ত বৈচিত্র্য
অধুনা

বহুত্বের মধ্যে একতা: বইয়ের পাতায় বন্দি সংবিধানের স্বপ্ন, রাজপথে রক্তাক্ত বৈচিত্র্য

19

আমাদের দেশের সংবিধানের প্রস্তাবনার অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য হল, দেশের নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলা। যাতে বহুত্বের মধ্যেও এক অনন্য ঐক্যবদ্ধ জাতির আত্মপ্রকাশ ঘটে। তাত্ত্বিকভাবে এই ধারণা অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং উপেক্ষার কোনও জায়গাই নেই। অন্যথায় রাষ্ট্রে ধরতে পারে বড়সড় ভাঙন কিংবা হামেশাই লেগে থাকতে পারে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি।

প্রশ্ন হল, আদতেও সংবিধান নির্মাতাদের এই লক্ষ্য কি সফল হয়েছে? এর উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ বা না-তে দেওয়া যাবে না। কারণ এক অংশের মানুষ সত্যি চেষ্টা করে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মিলেমিশে থাকার। কিন্তু আরেক অংশ এই আদর্শকে শুধুই বইয়ের পাতা থেকে পরীক্ষার খাতা অবধি সীমাবদ্ধ রাখে।

আজকের এই প্রতিবেদনটি এক্কেবারেই ধর্ম বা জাতপাতজনিত বিভেদকে কেন্দ্র করে নয়। এর বাইরেও আরও একটি সামাজিক ব্যাধি রয়েছে, যা দেশের দুই প্রান্তের মানুষের মধ্যে বিরোধ তৈরি করে। সেটি হল ভৌগলিক অবস্থানের ভিত্তিতে দেহের গড়ন, বিশেষ করে মুখমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য। প্রায়শই উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের মুখাবয়বের কারণে তাঁদের নানান কটূক্তি সহ্য করতে হয়। এহেন অপমান ও বৈষম্যমূলক আচরণ শুধু শব্দের আঘাতেই থেমে নেই, বরং বহুবার শারীরিক হেনস্থার অভিযোগও উঠেছে।

গত বছর ডিসেম্বর মাসে উত্তরাখণ্ডের দেরাদুন শহরে পাঠরত ত্রিপুরার এক যুবক বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্যের প্রতিবাদ করায় মাত্র ২৪ বছর বয়সে অকালমৃত্যু বরণ করেন। জানা গিয়েছে, এঞ্জেল চাকমা ও তাঁর ভাইকে ‘চিঙ্কি’, ‘মোমো’, ‘চাইনিজ’ সহ নানান নামে ডাকা হত। এর প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হন এঞ্জেল।

অভিযোগ অনুযায়ী, কটূক্তি শুনে শুনে এঞ্জেল বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। যার জেরে স্থানীয় একদল যুবকের সামনে প্রতিবাদ জানিয়ে এঞ্জেল বলেছিলেন, “আমরাও ভারতীয়, চীনের নাগরিক নই।” এঞ্জেলের এই বক্তব্যের প্রমাণ চান তাঁরা। এরপরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং স্থানীয় যুবকরা মিলে ত্রিপুরার ওই পড়ুয়াকে বেধড়ক মারধর করে। সপ্তাহখানেক হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর শেষ পর্যন্ত হেরে যান এঞ্জেল।

এরকম আরও অনেক ঘটনার উদাহরণ রয়েছে, বিশেষ করে দিল্লির মতো রাজধানী শহরে। সম্প্রতি দক্ষিণ দিল্লির মালভিয়া নগরে ভাড়া থাকা উত্তর-পূর্ব ভারতের তিন পড়ুয়া বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। জানা গিয়েছে, তাঁদের ফ্ল্যাটে এসি মেরামতির কাজ চলাকালীন ওপর থেকে ধুলো-ময়লা নিচে এসে পড়ে। তাতেই চটে যান নিচের তলার বাসিন্দারা। প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়, পরবর্তীতে সেই বিবাদই ব্যক্তিগত ও জাতিগত আক্রমণের রূপ নেয়। এছাড়াও, দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করা উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু ছাত্রের মুখেও একই রকমের অভিযোগ শোনা গিয়েছে যে, তাঁদের ক্যাম্পাসে অবমাননাকর নামে ডাকা হয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল, ২০১৪ সালে দিনের আলোয় দিল্লির লাজপত নগর বাজারে অরুণাচল প্রদেশের এক যুবককে লোহার রড দিয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোকানদাররা ওই যুবকের চেহারা ও সোনালী রঙ করা চুল নিয়ে হাসাহাসি করছিলেন। এরপরেই শুরু হয় জোর বচসা। অভিযোগ, তখনই জন্মসূত্রে অরুণাচল প্রদেশের নিডো তানিয়া নামক ওই যুবককে লোহার রড ও বাঁশ দিয়ে মারধর করা হয়। মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে গুরুতর চোটের কারণে পরদিন সকালে ঘুমের মধ্যেই মারা যান জখম যুবক। সেইসময় গোটা দেশ জুড়ে এই ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল। এমনকী উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয়টি নিয়েও তীব্র বিতর্ক দানা বেঁধেছিল।

চীন ছাড়াও ভুটান, মায়ানমার, কোরিয়া ও জাপানের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের চেহারার গড়নের কিছুটা মিল রয়েছে। কিন্তু চোখের কোণায় ভাঁজ বা নাক চ্যাপ্টা মানুষদের কটূক্তি করার সময় ওই দেশগুলির নাম নেওয়া হয় না। এর একটি বড় কারণ হল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে চীনের টানাপোড়েন ও বৈরিতা। ফলত, উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকেরা খুব সহজেই টার্গেট হয়ে যায়, বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশবাসীরা। সংশ্লিষ্ট বিষয়টি আলোচনা ও বিতর্কসভায় জায়গা পেলেও, প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে গুরুত্ব পায়নি। শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সীমান্তে কোনও সমস্যা দেখা দিলে তখনই ওই অঞ্চলের বিভিন্ন রকমের সমস্যাগুলির ওপর আলোকপাত করা হয় এবং কিছু সময়ের জন্য চর্চিত বিষয় হয়ে ওঠে।

সম্পর্কিত খবর