Shopping cart

  • Home
  • ফিচার
  • কলকাতার ‘অদৃশ্য’ এক-তৃতীয়াংশ
ফিচার

কলকাতার ‘অদৃশ্য’ এক-তৃতীয়াংশ

128

মহানগরী কলকাতার একদিকে যেমন পাঁচতারা হোটেল, ঝাঁ-চকচকে মলের ভিড় দেখা যায় এবং চারিদিকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বয়, সেই ‘সিটি অফ জয়’-এর আনুমানিক ১৫ লক্ষ মানুষ বস্তি এলাকায় বাস করে! এই সংখ্যা হল শহরের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই বস্তি এলাকার বহু অংশই অবস্থিত রেললাইনের পাশে এবং বছরের পর বছর ধরে জীবনের দ্বন্দ্বে বেঁচে থাকে এরা। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রকের মাঝের বেড়াজালে এই একদল মানুষের জীবন কাটছে শুধুই মৃত্যুভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে।

তিলজালা–টপসিয়া–টাংড়া, বাসন্তী কলোনি, শিয়ালদহ, পার্ক সার্কাস, বালিগঞ্জ, কুমোরটুলি-শোভাবাজার এগুলি এই শহরের অন্যতম বস্তি এলাকা এবং এর অধিকাংশই ট্রেন লাইনের পাশে অবস্থিত। এদের বস্তিগুলি ট্রেনলাইন থেকে ২ মিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত এবং বিপদ এই মানুষগুলির রোজকার জীবনের অঙ্গ। বহু বছর ধরে এই শহরে থেকে আজ তারা এই রাজ্যের নাগরিক হিসেবেই পরিচিত। তবে এদের মৌলিক মর্যাদাপূর্ণ জীবন কে নিশ্চিত করবে? মৌলিক সুবিধা যেমন পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য-সুরক্ষা সেগুলি কে নিশ্চিত করবে? এদের অধিকাংশই কর্পোরেশনের অধীনে কাজ করেন এবং মাসিক বেতন পান খুবই নগণ্য। সরকার এদের শুধুই ‘শ্রমিক’ হিসেবে গণ্য করে, নাকি মানুষ বা দেশের নাগরিক হিসেবে?

ট্রেন যখন পাশ দিয়ে যায়, তখন ঝুপড়ি ঘরের ভেতর থেকে হাওয়ার প্রবল ঝাপটা আর কম্পন অনুভব করা যায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অসাবধানতা মানেই জীবন শেষ। ট্রেনের হাওয়ায় চোখে-মুখে পাথরের কুচি ছিটকে দেয়, কত মানুষের হাত-পা কাটা গেছে তার হিসেব নেই এখানে। কলকাতা পৌরসভা (কেএমসি) বস্তিগুলিকে তাদের আইনি অবস্থা, মালিকানার মেয়াদ এবং প্রদত্ত নাগরিক পরিকাঠামোর স্তরের উপর ভিত্তি করে প্রধানত দুটি স্বতন্ত্র শ্রেণিতে ভাগ করে: নিবন্ধিত বস্তি (বস্তিবাসী) এবং অনিবন্ধিত বস্তি (অবৈধ বসতি)। অনিবন্ধিত বস্তিগুলিই পোর্ট ট্রাস্ট, রেল প্রান্তিক জমিতে দেখা যায় এবং তাই পৌরসভা নিবন্ধিত বস্তির মতো এই বস্তিগুলিতে মৌলিক সুবিধা প্রদান করে না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, সরকার যদি কোনো ব্যক্তিকে রাজ্যের ভোটার বলে গণ্য করে তবে তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাও রাজ্যের কর্তব্য। এবং এই ঝুপড়ির মানুষগুলোর কাছে আধার কার্ড আছে, ভোটার আইডি আছে, এমনকি রেশন কার্ডও আছে। অদ্ভুতভাবে, সেই কার্ডগুলোতে ঠিকানাও দেওয়া আছে- নেই শুধু মৌলিক অধিকার প্রাপ্যের কার্ড।

এনসিআরবির ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ট্রেন দুর্ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করে (উত্তরপ্রদেশের পরে)। ৮০০-র মধ্যে ৫৮১ জনের বেশি ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যান। এই দুর্ঘটনাগুলির অধিকাংশই হয়ে থাকে সন্ধ্যে ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। কারণ সেই সময় এই বস্তিতে ভিড় বাড়ে এবং ট্রেনও তুলনামূলক বেশি আসা-যাওয়া করে ওই সময়।

রেললাইনের ধারের এই বস্তিগুলোতে নেই কোনো সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা শৌচাগার। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে জন্ডিস বা ম্যালেরিয়ার মতো রোগ লেগেই থাকে। এবং জন্ডিসের প্রতিরোধে অনেকে ‘জন্ডিসের মালা’ পরেন, যা প্রমাণ করে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের চেয়ে তারা আজও অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাসের ওপর কতটা নির্ভরশীল। ১০ বাই ১০ ফুটের এক একটি ঘরে সাত-আট জন মানুষের বসবাস—যেখানে জীবনধারণের ন্যূনতম মর্যাদাও উপেক্ষিত।

আমাদের দেশের বস্তি ব্যবস্থাপনা সংবিধানের ৭ নং তফসিলে আটকে আছে। সেই ৭ নং তফসিলে রাজ্যের এবং কেন্দ্রের আলাদা তালিকা রয়েছে। ভূমি এবং লোকস্বাস্থ্য রাজ্যের তালিকার অন্তর্গত, তাই সেই হিসেবে বস্তি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের বলে গণ্য হয়। আবার অন্যদিকে কেন্দ্রীয় তালিকায় রেল অন্তর্ভুক্ত। এবং এখানেই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ফিরে আসে। রেল চায় এই বস্তিগুলিকে ট্রেনলাইন থেকে সরিয়ে দিতে, কিন্তু অন্যদিকে রাজ্য সরকার নিজের ভোটারদের সরাতে রাজি নয়। এই জন্যই অনেক সময় এই জায়গাগুলিতে যখন বস্তি সরিয়ে পাকা বসতি স্থাপনের উদ্যোগ উঠলেও রেলমন্ত্রক ওই এলাকায় অনাপত্তি সার্টিফিকেট (এনওসি) দিতে রাজি হয় না এবং এতেই মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এই বস্তির মানুষেরা দ্বিধায় দিন কাটায়।

এই মানুষগুলোর জীবনসংগ্রাম কেবল অভাবের গল্প নয়, এটি আসলে এক চরম অবহেলার দলিল। অদ্ভুত এই বৈপরীত্য—যাদের শ্রমে শহরটা সচল থাকে, যাদের ঘামে রাজপথ পরিষ্কার হয়, তাদেরই রাত কাটে এমন এক জায়গায় যেখানে কোনো ঠিকানার অস্তিত্ব নেই। কাগজের নথিতে ঠিকানা হিসেবে হয়তো কোনো স্কুলের নাম বা অলিগলির নম্বর লেখা থাকে, কিন্তু বাস্তবে তাদের কোনো মাটি নেই। তারা কেবল এক একটি সংখ্যা মাত্র, যারা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একবার ‘নাগরিক’ হওয়ার সুযোগ পায়, কেবল ভোটযন্ত্রের বোতাম টেপা পর্যন্তই যাদের গুরুত্ব সীমাবদ্ধ। এই ‘সিটি অফ জয়’-এর সবটুকু আনন্দ কি তবে শুধুমাত্র ওপরতলার মানুষদের জন্যই বরাদ্দ? যারা রেললাইনের ধুলো মেখে বেঁচে থাকে, তাদের কান্নায় কি তবে বাতাসের কোনো কম্পন সৃষ্টি হয় না? হয়তো কোনোদিন এই ট্রেনের সমান্তরাল রেখাগুলো এক হবে, হয়তো কোনোদিন উন্নয়নের আলো এই আঁধার চিরে তাদের ঘরেও পৌঁছাবে—এই ক্ষীণ আশাটুকু সম্বল করেই শিয়ালদহ বা হাওড়াগামী ট্রেনের গর্জনের মাঝে ঘুমিয়ে পড়ে এক শহর-ভরা দীর্ঘশ্বাস।

সম্পর্কিত খবর