তৃণভোজী, চতুষ্পদটি নীল গ্রহের অন্যত্র কেবলই জীব মাত্র হলেও, ভারত ভূখণ্ডে পৌঁছালেই এই জীবটির “স্ট্যাটাস” বদলে যায়। তৃণভোজী চতুষ্পদ কুলের সামান্য জীবটিই হয়ে ওঠে আদ্যন্ত রাজনৈতিক মর্যাদাসম্পন্ন একটি গুরুগম্ভীর প্রাণী। এতটাই রাজনৈতিক যে ভারত ভূখণ্ডের সুবিস্তীর্ণ অংশের নামই হয়ে গিয়েছে “গোবলয়”। সেখানে গরু শুধুমাত্র কৃষি অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, ধর্মবিশ্বাস এবং ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতিরও কেন্দ্রবিন্দু। “আধুনিক” ভারতে গরুর রাজনৈতিক প্রাণী হয়ে ওঠার সূত্রপাত ১৮৯০-এর দশকে আর্য সমাজিদের হাত ধরে হলেও, গরু কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কোন্দলের ইতিহাস ভারতে অন্তত বেশ সুপ্রাচীন। ঋগ্বেদে গোসম্পদের দখলদারির প্রশ্নে সংঘর্ষের বিবরণ পাওয়া যায়। বলাবাহুল্য, সেগুলি এক অর্থে রাজনৈতীকই। ঋগ্বৈদিক সমাজে সম্পদের নিক্তি, বিনিময়ের মাধ্যমও গরু। দেবতার কাছে গোসম্পদের আকুল প্রার্থনার পাশাপাশি একই গ্রন্থে আবার পাওয়া যায় গোমাংস ভক্ষণেরও নজির। এসব অশাস্ত্রীয় কথা নব্য সনাতনীরা যদিও বিশ্বাস করবেন না, তবু ব্যাপারখানা বেদ মতেই সত্য। তবে যেহেতু এ বিষয়ে প্রচুর জলঘোলা ও লেখালেখি ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে, তাই আপাতত প্রসঙ্গটি রদ করা যাক। আগ্রহীরা বরং ঐতিহাসিক ডি. এন. ঝা-র লেখা চমৎকার বইটি পড়ে নেবেন।
আপাতত, বেদ থেকে চলে আসা যাক বর্তমান ভারতে। এ কথা বলাবাহুল্য, বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতীয় রাজনীতিতে গরুর প্রভাব বেড়েছে এক ধাক্কায়। গোমাতা, গোমাংস এবং গোরক্ষক বাহিনী বর্তমান ভারতে গেরুয়া রাজনীতির ভাষ্য এবং কার্যের প্রধানতম না হলেও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ—এ নিয়ে বোধকরি বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। গরু এবং গোমাংসকে কেন্দ্র করে অপরীকরণের যে সহিংস রাজনীতি পেহেলু খান, আখলাখকে দিয়ে শুরু হয়েছিল, তার বিজয় রথ থামার বদলে বরং গড়গড়িয়ে এসে পৌঁছেছে বাংলায়৷ জমজমের বিফ মালাই, জাকারিয়া স্ট্রিটের বিফ কাবাবের সমঝদারিত্বের পাশাপাশিই তৃণমূল আমলেই ক্রমে জাঁকিয়ে বসছিল গরু আর গোমাংসকে কেন্দ্র করে অপরীকরণের গেরুয়া রাজনীতি। অতঃপর, বিজেপির বাংলা জয়। আর যথারীতিই, বাংলাকে এক্সটেন্ডেড গোবলয়ের অংশ হিসেবে গড়েপিটে তুলতে সদ্য শপথ নেওয়া বিজেপি সরকার ফাইলের ধুলো ঝেড়ে তুলে এনেছে পাঁচের দশকের স্লটার অ্যাক্ট। উদ্দেশ্য স্পষ্ট; গরু এবং গোমাংসের ওপর বিধিনিষেধের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধর্মের নাগরিকদের কোণঠাসা করা।
বিজেপির সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই কয়েক জায়গায় বিজেপির বিধায়কদের নেতৃত্বে ইতিউতি গোরক্ষক বাহিনীর সহিংস অভিযান, অভিনব হলেও কাকতালীয় বোধহয় নয়। অভিনব, কারণ বাঙালি কিশোর বিবেকানন্দ জীবনী পড়ে এতকাল গোরক্ষকদের চিনে এসেছে বিজাতীয় হাস্যকর ধর্মান্ধ গোষ্ঠী হিসেবে। দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহের বদলে গোমাতার সেবায় চাঁদা চাইতে আসা গোরক্ষিণী সভার নেতাকে বিবেকানন্দর সেই সহাস্য কটাক্ষ, “গরু যে আপনাদের মা তা বেশ বুঝতে পারছি। গরু মা না হলে এমন কৃতি সন্তান জন্মাতো কী করে?”—কোণ বাঙালি কিশোর না জানে? একই রকম, গরুকে কেন্দ্র করে অপরীকরণের রাজনীতি, বাংলা সাহিত্যের সিলেবাসে “মহেশ” পড়ে বড় হওয়া বাঙালি তরুণের কাছে বিসদৃশ লাগার কথা ছিল। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এমনটা হয়নি। গরু কেন্দ্রিক অপরীকরণের রাজনীতি বেশ তোড়জোড় করে, উল্লেখযোগ্য সমর্থনসহই শুরু হয়েছিল। আশাটি ছিল, এভাবেই পরধর্মের মানুষজনের খাদ্যাভ্যাস, জীবন ও উৎসব দুর্বিষহ করে তোলা যাবে। বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র এই মহতি উদ্দেশ্যেই বেরিয়ে পড়েছিলেন চালান গরুদের বার্থ সার্টিফিকেট খুঁজতে।
শুরুতে সব ভালোই চলছিল। কিন্তু তারপরই এলো এক অদ্ভুত প্লট টুইস্ট। গোরু কিনতে, গোমাংস কিনতে ঈদের মরসুমে বেঁকে বসলেন যাদের লক্ষ্য করে এই অপরীকরণের রাজনীতির অবতারণা, সেই বাঙালি মুসলমানরা স্বয়ং। সংঘবদ্ধভাবে তারা নব্য হিন্দুদের গোমাতাকে সম্পূর্ণ বয়কটের রাস্তায় হাঁটলেন। ফলাফল অভাবনীয়। বিপাকে পড়লেন হিন্দু গোপালক বা গোয়ালারা। বিজেপির উচ্চবর্ণ, উচ্চবর্গের নেতারা জীবনে গরু পালন করেননি। রাজনীতি করেছেন গরু নিয়ে, কিন্তু কাছ থেকে দেখেননি বাংলার গোব্যবসায় আসলে কাদের স্টেক বেশি। গরুকে মাতা জ্ঞানে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়া বিজেপি নেতাদের বোধহয় অজানাই ছিল, হিন্দু গোপালকরা দুধ দেওয়া বন্ধ করলে গোরু বিক্রি করে দেন। বাছুর জন্মালেও বিক্রি করে দেন। আর কুরবানি ঈদে হাটে গরু বেচে বেশ ভালো পরিমাণ মুনাফাই ঘরে তোলেন। কুরবানি ঈদের কথা মাথায় রেখেই ধারদেনা করে গরু কেনেন হিন্দু গোপালকরা।
এখন, বিজেপির স্লটার অ্যাক্ট জনিত বাহাদুরি, গোরক্ষক হুজ্জতি এবং পরিণামে বাঙালি মুসলমানদের সটান গরু বয়কটের ফলশ্রুতিতে হিন্দু গোয়ালারাই পড়লেন বিপদে। ধার শোধ করবেন কী করে, গরু বিক্রি বন্ধ হলে দুধ না দেওয়া গরু, বাছুর বা বৃদ্ধ গরুর কী ব্যবস্থা করবেন তা তারা জানেন না। গরু পুষতে খরচ লাগে। সে খরচ উঠবে কী করে? কোনো উত্তর নেই বিজেপি সরকারের কাছে। অথচ এই বিজেপিকেই ঢেলে ভোট দিয়েছিলেন গোয়ালারা। বাংলায়, ২০১৪ পরবর্তীতে, বিজেপির সংগঠন প্রাথমিকভাবে গড়ে উঠতে পেরেছিল বাঙালি হিন্দু গোয়ালাদের সমর্থনের ভিত্তিতে। আজ সেই বিজেপিই ক্ষমতায় এসে পথে বসিয়েছে ওই হিন্দু গোয়ালাদেরই। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে গোয়ালাদের কাতর আর্তি। গরু কুরবানি আগের মতন চালু করার আবেদন করছেন হিন্দু গোয়ালারা স্বয়ং। গরু কেনাবেচার ওপর গোরক্ষকদের হুজ্জতি বন্ধ করার দাবিও করছেন তারা। জানাচ্ছেন কুরবানি ঈদে গরু বিক্রি করতে না পারলে দেনার দায়ে তাদের বিষ খেতে হবে।
উল্টোদিকে বাঙালি মুসলমানরা অনড়, গোসত্যাগ্রহে। তারা পণ করেছেন, গরু তারা কিনবেন না, গরু কুরবানিও দেবেন না, গোমাংসও খাবেন না। কুরবানির হাটে মুসলমানরা হিন্দু গোব্যবসায়ীদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন—এ দৃশ্য দেখা গিয়েছে বাংলার একাধিক জায়গায়। অভিনবত্বের দিক দিয়ে এ জিনিস কেবল বাংলাতেই নয়, দেশেও আগে কখনও ঘটেনি। গরু কেন্দ্রিক অপরীকরণের রাজনীতিতে এতদিন কেবল মুসলমানরা ভিক্টিমই হয়ে এসেছেন দেশজুড়ে। মার খেয়েছেন, নিহত হয়েছেন, জেলে গিয়েছেন। কারোর কিছু যায় আসেনি। চেনা পরিচিত এই ছককে সারা দেশে প্রথম উল্টে দিলেন বাঙালি মুসলমানরা। তাদের সংঘবদ্ধ, সুচিন্তিত গোসত্যাগ্রহ বিজেপিকে বিপাকে ফেলবেই। আর কয়েকদিন পরেই ঈদ। বাঙালি মুসলমান গোসত্যাগ্রহে অনড় থাকলে, বিজেপি সমর্থক বাঙালি হিন্দু গোয়ালা ধার করে কেনা গরুগুলি বেচবেন কাকে?












