Shopping cart

  • Home
  • ফিচার
  • আদতে আরজি কর আন্দোলনই পরোক্ষভাবে হারিয়ে দিল তৃণমূলকে?
ফিচার

আদতে আরজি কর আন্দোলনই পরোক্ষভাবে হারিয়ে দিল তৃণমূলকে?

136

দিনটা ৮ আগস্ট। মধ্যরাত্রি। বাংলা হারিয়েছিল তার সোনার মেয়েকে। বাংলায় মায়ের এক সন্তানের এহেন পরিস্থিতি সকলকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অভিযোগ, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছিল সোদপুরের এক ডাক্তারি পড়ুয়া ছাত্রীকে। তার বিচার চাইতে পথে নেমেছিল গোটা বাংলা। রাতজাগা থেকে মোমবাতি মিছিল— কী না হয়েছে! যদিও এর জন্য শাসকের কম চোখ-রাঙানি সহ্য করতে হয়নি আমজনতাকে। সেই সময় স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ উঠেছিল যে, তাঁরা নাকি প্রতিবাদী মানুষদের কণ্ঠস্বর রোধ করতে বিভিন্নভাবে চাপ তৈরি করেছিলেন। আরও বিতর্কিত বিষয় হলো, নির্যাতিতার এলাকার বিধায়কের কীর্তি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি তিলোত্তমার পরিবারের কোনওরকম সম্মতি ছাড়াই দেহ দাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর এই হঠকারিতা খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে সন্দেহের বীজ পুঁতেছিল। আজও সেই প্রশ্নের উত্তর চায় মানুষ— কেন এত তাড়াহুড়ো করলেন পানিহাটির তৎকালীন বিধায়ক? এর নেপথ্যে কোন কারণ? এমনকী শাসক শিবিরের সর্বোচ্চ নেতৃত্বও সেই সময় মুখে কুলুপ এঁটে বসেছিলেন। আর শাসকের এই নীরবতা দেখে রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন বাংলার মানুষ। ফলে, জনমানসে শাসকের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ সঞ্চার হয়। আন্দোলনে নামে গোটা পৃথিবীর বাঙালি। নির্বাচনে তারই ফল ভোগ করতে হয় তৃণমূলকে।

প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছিলেন যে, আরজি কর কাণ্ড ঘিরে যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ সঞ্চারিত হয়েছিল তা শুধুই শহরকেন্দ্রিক এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন তা ভুল প্রমাণিত হলো। কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে বঙ্গের নির্বাচনে এবারই প্রথম ভোটদানে রেকর্ড গড়েছেন মহিলারা। বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনের (২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে) পর থেকে দেখা গিয়েছে যে, মহিলা ভোটাররাই তৃণমূলের জয়ের জিয়নকাঠি। এবারের নির্বাচনে যে হারে মহিলা ভোট পড়েছিল, তাতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল অধিকাংশ মহিলা ভোট যাবে জোড়াফুলের ঘরে। কিন্তু ৪ তারিখ (মে, ২০২৬) ইভিএম খুলতেই দেখা গেল উল্টো চিত্র। তৃণমূলের মহিলা ভোটব্যাংকে ধরেছে বড়সড় ধস। আগের সরকারের উদ্যোগে চালু হওয়া ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’, ‘রূপশ্রী’-র মতো নারীকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো এবারের ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসকে আর শক্তির জোগান দিতে সাহায্য করেনি।

বলাই বাহুল্য, বর্তমান সময়ে নির্বাচনী প্রচার থেকে শুরু করে প্রতিবাদ জানানো— সব ক্ষেত্রেই সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ষণ কাণ্ডের পরের দিন থেকে নির্বাচনের আগের দিন অবধি, ঘটনার নৃশংসতা ও শাসকের ম্লান ভূমিকা নিয়ে নানা সমালোচনামূলক মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরপাক খেতে দেখা গিয়েছে। কোথাও গিয়ে সেটাও হয়তো ভোটারদের মনে সাড়া ফেলেছে। আর তিলোত্তমার মায়ের প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত তৃণমূলের হারের পিছনে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ রাখে না যে, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়ায় আরও ইন্ধন জুগিয়েছে অভয়ার মায়ের নির্বাচনে লড়াইয়ে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত।

উল্লেখ্য, একটা সময় যখন মনে করা হচ্ছিল যে সময়ের নিয়মে আরজি কর কাণ্ড পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে এবং এই নির্বাচনে সেটা আর তেমন কোনো ইস্যুই নয়, ঠিক সেই সময়েই বিজেপি পানিহাটি কেন্দ্রে আরজি করের ওই ডাক্তারি পড়ুয়ার মাকে প্রার্থী ঘোষণা করল। ব্যস, তাতেই নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে উঠল অভয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যু তথা আরজি করের ভয়াবহ ধর্ষণকাণ্ড। সেই সঙ্গে যুক্ত হলো নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন রত্না দেবনাথকে হেনস্থা করার ঘটনা।

প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণার পরই বারংবার অপমানের সম্মুখীন হতে হয়েছিল অভয়ার মাকে। কখনও গানের মাধ্যমে সন্তানহারা সেই মাকে কটাক্ষ করা হয়েছিল, আবার কখনও শাসকশিবির-সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি তাঁকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সেই সমস্ত ঘটনার জবাব যেন ভোটবাক্সে দিয়েছে জনগণ।

তৎকালীন শাসকশিবির-ঘেঁষা একাংশের যুক্তি ছিল— তাহলে কি এবার থেকে সব ভিকটিম পরিবারকে নির্বাচনের টিকিট দেবে বিজেপি? তাঁরা হয়তো আরজি কর কাণ্ডের সঙ্গে বাকি অপরাধমূলক ঘটনার ফারাক কোথায়, সেটা বুঝতেই পারেননি; অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করে সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। যদিও তাঁদের যুক্তিহীন সাফাই শেষপর্যন্ত ধোপে টেকেনি। তবে অভায়াকাণ্ড যে ২৬-এর নির্বাচনে গেরুয়া শিবিরের ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে, সেটাও অস্বীকার করা যাবে না।

আরজি কর কলকাতার অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল। সেই হাসপাতালে এমন ঘটনা যা কার্যত মেনে নেওয়া অসম্ভব। এই ঘটনার পরপর আরও কয়েকটা ধর্ষণকাণ্ডের অভিযোগ সামনে এসেছে, যা বারংবার তৃণমূল শাসনকালে রাজ্যের নারী সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অন্যদিকে, শাসক ও প্রশাসনের ভূমিকা ছিল অনেকটা রোমের স্বৈরাচারী শাসক নিরোর মতো। সবটাই ভোটারদের মনে বিরাট প্রভাব ফেলেছে।

এছাড়াও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং তৃণমূলের ছোট, বড়, মেজো, সেজো সব সারির নেতাদের সীমাহীন ঔদ্ধত্য ও তাঁদের চোখ ধাঁধানো সম্পদ বৃদ্ধি, কাটমানি সিস্টেম— তৃণমূলের হারের নেপথ্যে এসব কারণ তো রয়েছেই।

সম্পর্কিত খবর