Shopping cart

  • Home
  • ফিচার
  • মৌমাছির ঐক্য, মানুষের সংকট: দুয়ারে যখন ভিমরুল
অধুনা

মৌমাছির ঐক্য, মানুষের সংকট: দুয়ারে যখন ভিমরুল

25

ছোট্ট মৌমাছি আর বিরাট ভিমরুলের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের কাহিনী। ডাকাত শুধু মানুষের ঘরে পড়ে না, মৌমাছির ঘরেও পড়ে। মানুষের ঘরে যেমন নানা সঞ্চয়, মধুমৌমাছিদের ঘরেও তো তাই! বিরাট বড় মৌচাকে কত মৌমাছি, কত মধু, আর রানী যে রোজ ডিম পাড়েন, সেই এত ডিম এত লার্ভা! বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভিমরুল, এশিয়ান জায়ান্ট হর্নেটরা দলবেঁধে থাকে। বাসা করে মাটির নিচে। এমনকি ইঁদুরদের ফেলে যাওয়া পুরনো বাসাকেও কাজে লাগায়। বিরাট চেহারার এই বোলতার মুখে ভীষণ শক্ত দুটো দাঁড়া থাকে। সেই দাঁড়া দিয়ে তারা কাঠ কাটতে পারে, মাটি খুঁড়তে পারে, আবার ছোট-বড় নানা সাইজের পতঙ্গের ঘাড় ভাঙতে পারে অনায়াসে। খাবারের খোঁজে এদিক-ওদিক দৌড়ানোর চেয়ে ঘর-গেরস্থালি নিয়ে বাস করে থাকা মধুমৌমাছিদের দিকে তাদের নজর বেশি! কারণ সেখানে গেলে তারা মৌমাছি, মৌমাছির লার্ভা, মধু সব একসঙ্গে অনেকটা খেতে পাবে। সবচেয়ে প্রিয় মৌমাছির লার্ভার স্বাদ! তাই তারা বারবার হানা দেয় মৌচাকে বা মৌবাক্সে।

মৌমাছিদের দলে যেমন স্কাউট থাকে, তার কাজ যেমন ফুল, জল, নতুন আশ্রয় ইত্যাদি খুঁজে এনে চাকে ফিরে নৃত্য করে বাকিদের খবর দেওয়া, ভিমরুলদের দলেও এমন স্কাউট থাকে। তাদেরই একজন খুঁজতে যায় মৌমাছির চাক। মৌমাছিদের চাকের মুখে পাহারা দেয় প্রহরী মৌমাছিরা। ভিমরুলকে বাসার আশেপাশে উড়তে দেখে তারা বিপদ বুঝতে পারে। শব্দ করে, নেচে, সবাই মিলে তারা একধরনের ঢেউ তোলে ভিমরুলকে ভয় দেখিয়ে তাড়াবার জন্য। ভিমরুল ভয় পায় না। প্রহরীদের ভিড়ে মাথা দিয়ে ধাক্কা মেরে মেরে সে ছত্রখান করে দেয় মৌমাছিদের প্রাথমিক আত্মরক্ষা কবচ। মৌমাছিরা বেগতিক দেখে বাসার ভেতরে ঢুকে নতুন করে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি শুরু করে। ওদিকে ভিমরুল তখন একটা আশ্চর্য কাজ করে। ভিমরুল জানে মধুমৌমাছিরা একা থাকে না। হাজার হাজার মধুমৌমাছি একসঙ্গেই থাকে, তাই একা তাদের জব্দ করা যাবে না। অনেকে মিলে আসতে হবে। ফিরে যে আসবে, ঠিকানা পাবে কোথায়? মৌচাক চিনবে কী করে? এশিয়ান জায়ান্ট হর্নেট সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র ভিমরুল, যে তার শরীরের গন্ধ দিয়ে ভালো করে চিহ্নিত করে যায় মৌচাক।

“দাঁড়া! বাকি সব বোনেদের নিয়ে ফিরে আসছি! এই গন্ধ দিয়ে তোদের চাক চিহ্নিত করে গেলাম!”

বাসার ভেতর থেকে মৌমাছিরা সব দেখে। দেখে আর বোঝে ভিমরুলটা কী করছে। এরপরে কী হতে চলেছে। এই পৃথিবীতে বোলতা/ভিমরুল আগে এলেও মৌমাছিদের বয়স কম হলো না সেই ক্রিটেশিয়াস যুগ থেকে! ফুল থেকে স্রেফ মকরন্দ, পরাগ সংগ্রহ আর সন্তান লালন-পালনের সঙ্গে সঙ্গে অজস্র অসংখ্য আক্রমণ তাকে প্রতিহত করতে হয়, বাঁচতে হয়। সে অনেক কিছু শিখেছে এতগুলো যুগ ধরে। ভিমরুল চলে যাওয়ার পর তাই অনেকে মিলে তার গন্ধ মুছতে শুরু করে। দ্রুত কয়েকজন মৌমাছি চলে যায় সুগন্ধি পাতা কেটে আনতে। সেই পাতা দুয়ারের মুখে ঘষে ঘষে তারা সব গন্ধ মুছে দেবে। তবে এই কাজ করতে করতেই দলবল নিয়ে চলে আসে ডাকাতে ভিমরুলের দল। মৌমাছিরা আবার ঢুকে পড়ে বাসার ভেতরে। বীরের মতো প্রথম লাইনে দাঁড়ায় অভিজ্ঞ প্রহরী বা কম্যান্ডাররা। তারা জানে এবার তারা কী করবে। তারা জানে শত্রু তাদের চেয়ে অনেক গুণে বড়, অনেক গুণে প্রবল, কিন্তু তারা এও জানে, তারা অনেকে মিলে এই বড় শত্রুর চেয়েও বড়। বাসার ছোট্ট দুয়ারের ফাঁকে একে একে ভেসে ওঠে শক্ত দাঁড়াওয়ালা গগলসের মতো বড় বাদামি চোখওয়ালা ভিমরুলদের মুখ। চোখের সামনে দু-একটা মৌমাছিকে ইতিমধ্যেই যারা কুটি কুটি করে ফেলেছে। তাদের নাকে আসছে চাক ভর্তি ডিম, লার্ভা আর মধুর গন্ধ। তারা অস্থির হয়ে উঠছে ক্ষুধায়, কিন্তু দুয়ার এত ছোট, তাদের মাথা গলাবার জো অবধি নেই! ক্ষুধার্ত ভিমরুলরা অতঃপর ঠিক করে শক্ত দাঁড়া দিয়ে দুয়ারের কাঠ কেটেই তারা চাকে ঢুকবে। ঢুকে তছনছ করে ফেলবে সব। ছোট মৌমাছি, শান্তভাবে চোখে চোখ রেখে সব দেখতে থাকে। তাদের চোখের সামনে ভিমরুলদের একজন কাঠ কেটে দুয়ার ভেঙে ঢুকে পড়ছে চাকে। অভিজ্ঞ কম্যান্ডার মৌমাছি তখনও একেবারে শান্ত, ধীর। তার পিঠের ওপারে হাজার হাজার কর্মী মৌমাছি শুধু একটা আদেশের অপেক্ষায়। আর কম্যান্ডার অপেক্ষা করে আছেন সঠিক সময়ের! আর একটু! আর একটু আয়! একটু এদিক-ওদিক হলে সবার আগে তার মাথাও কাটা যেতে পারে। তবু এই চরম মুহূর্তে, এই বিরাট শত্রুর সামনে তার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দেখবার মতো!

ভিমরুল এগোতে থাকে। একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে আসতেই নীরবে, সামনের দুই পা জোড়া তুলে হাজার হাজার মৌমাছিকে একটা নির্দেশ দেন কম্যান্ডার। অকুতোভয় মৌমাছিরা হাজারে হাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিরাট ভিমরুলের শরীরে। নিমেষে ভিমরুল ঢেকে যায় মৌমাছির স্তূপে। প্রচণ্ড দ্রুত গতিতে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে, থোরাসিক মাসল কাঁপিয়ে তাপ বাড়াতে থাকে মৌমাছির দল। তাপ বাড়াতে থাকে যতক্ষণ না ভিমরুলটা প্রায় ভাজা হয়ে যায়! তাপ বাড়াতে থাকে, আর বাড়তে থাকে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ। একটা তপ্ত গোলকে পরিণত হয় মৌমাছির দল। এই তাপে ভিমরুলের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই। ভাঙা দরজা দিয়ে আবার ঢুকতে থাকে আরেকটা ভিমরুল! আবার মৌমাছিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে একইভাবে। এইভাবে, তারা লড়াই করে ভিমরুলদের রুখে দেয়। ভিমরুলরা একথা জানত না তা নয়। তাই তো তারা দল বেঁধে এসেছিল। তবু মৌমাছিদের ঐক্যের কাছে হার মেনে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এই লড়াইয়ে কিছু মৌমাছির প্রাণ চলে যেতে পারে। তারা সেকথা না ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। রক্ষা পায় অজস্র সদ্যোজাত মৌমাছি, রানী, চাকে অনেক কষ্ট করে লক্ষ-কোটি ফুল থেকে জমানো মধু, পরাগ এবং তাদের গোটা সংসার। এই সংসার সাজাতেও বহু মৌমাছি প্রাণ দেয়, এই সংসার রক্ষা করতেও।

এই অসামান্য রুদ্ধশ্বাস গল্প চোখের সামনে আমরা হতে দেখেছি মৌচাকে। একেক মধুমৌমাছির একেক ধরনের আত্মরক্ষার কৌশল, একেকরকমের শব্দ, ঢেউ। তবে এই গল্পকে ক্যামেরায় অসাধারণভাবে ধরেছেন: বার্তি গ্রেগরি। বার্তি আমাদের প্রজন্মের দুর্ধর্ষ এক মানুষ। তাঁকে উচ্ছ্বসিত অভিনন্দন জানাই।

টাইটানিকের পরিচালক জেমস ক্যামেরন প্রযোজিত “Secrets of Bees” তথ্যচিত্রে ফুটে উঠেছে মৌমাছিদের জীবনের অনেক কাহিনী। এত বড় একজন পরিচালক আজ এই সংকটের দিনে এত সুন্দর, গুরুত্বপূর্ণ একটা তথ্যচিত্র বানিয়েছেন, তার জন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানাই। তথ্যচিত্রের প্রিমিয়ার হয়ে গেছে পয়লা এপ্রিল। সেদিনই দেখেছি দুচোখ ভরে। জানাতে একটু দেরি হলো নানা কারণে। মৌমাছিদের এই ঐক্য আমাদের মধ্যে তেমন নেই। অথচ ভিমরুলের মতো বড় বড় শত্রু একে একে আমাদের আক্রমণ করছে। এসে দাঁড়াচ্ছে দুয়ারে। দুয়ার, ঘর-সংসার ভাঙছে। আমরা কি মৌমাছিদের কাছ থেকে কোনো পাঠ গ্রহণ করব না?

সম্পর্কিত ট্যাগ:

সম্পর্কিত খবর